
অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার মৌলিক কাঠামোতে শ্রমিক ও মালিক—এই দুই শ্রেণির পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতির পরিভাষায়, যারা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা বা বিভিন্ন পেশায় কোনো কর্মকর্তার অধীনে শ্রম দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন, তারাই শ্রমিক বা শ্রমজীবী মানুষ।
অপরদিকে যারা এই শ্রমিকদের নিয়োগ দেন, তাদের কাছ থেকে কাজ আদায় করেন এবং বিনিময়ে মজুরি বা বেতন প্রদান করেন, তারাই মালিক। এই দুই পক্ষের সুষ্ঠু সম্পর্কের ওপরই নির্ভর করে একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতি ও সামাজিক ভারসাম্য।
মানবজীবন ও রাষ্ট্রের উন্নতির মূল চালিকাশক্তি হলো শ্রম। কোনো জাতির উন্নতি নির্ভর করে সেই জাতির মানুষের কর্মস্পৃহা, পরিশ্রম এবং উৎপাদনশীলতার ওপর। যে জাতি যত বেশি শ্রমনিষ্ঠ, উদ্যমী ও দায়িত্বশীল, সে জাতি তত দ্রুত উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
শ্রমের ক্ষেত্রে কোনো কাজ ছোট বা বড় নয়—একজন দিনমজুর, কৃষক, শিক্ষক, কর্মকর্তা কিংবা ব্যবসায়ী—সবার শ্রমই সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্মানের দাবি রাখে। এই দৃষ্টিভঙ্গিই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের ভিত্তি স্থাপন করে।
ইসলাম শ্রমকে শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখেনি, বরং এটিকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। পবিত্র কোরআন আল্লাহ–তাআলা নির্��েশ দিয়েছেন যে নামাজ শেষে মানুষ যেন জমিনে ছড়িয়ে পড়ে এবং জীবিকা অন্বেষণে আত্মনিয়োগ করে (সুরা জুমা, আয়াত: ১০)
অর্থাৎ ইবাদত ও কর্ম—এই দুইয়ের সমন্বয়েই একজন মুসলিমের জীবন পূর্ণতা পায়। ইসলাম মানুষকে কর্মবিমুখতা থেকে বিরত রেখে উৎপাদনশীল জীবনযাপনের প্রতি উৎসাহিত করেছে।
ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমের মর্যাদা এতটাই উচ্চ যে নবী-রাসুলগণও শ্রমকে নিজেদের জীবনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। মুহাম্মদ (সা.) নিজেও জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে শ্রম করেছেন। একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে তিনি মক্কার লোকদের ছাগল চরিয়েছেন এবং এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২২০৭)
এটি প্রমাণ করে যে শ্রম কোনো অসম্মানের বিষয় নয়; বরং এটি আত্মসম্মান ও আত্মনির্ভরতার প্রতীক। একইভাবে অন্যান্য নবিগণও শ্রমের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেছেন।
হজরত দাউদ (আ.) নিজের হাতে উপার্জিত অর্থেই জীবনযাপন করতেন। হজরত মুসা (আ.) দীর্ঘ সময় শ্রম দিয়ে জীবনের প্রয়োজন মিটিয়েছেন। এসব উদাহরণ থেকে স্পষ্ট হয় যে শ্রম ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত সম্মানজনক এবং এটি নবিদের সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত।
শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও ন্যায়ভিত্তিক। মহানবি (সা.) শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক পরিশোধ করতে হবে। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৪৪৩)
এই নির্দেশ শুধু অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারই নিশ্চিত করে না, বরং মানবিক মূল্যবোধকেও সুদৃঢ় করে।
এছাড়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিসে বলা হয়েছে যে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তিন শ্রেণির মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন, তাদের মধ্যে একজন হলো সেই ব্যক্তি, যে শ্রমিক নিয়োগ করে তার কাজ আদায় করে নেয় কিন্তু যথাযথ পারিশ্রমিক প্রদান করে না। এটি শ্রমিকের অধিকার লঙ্ঘনের ভয়াবহ পরিণতির প্রতি কঠোর সতর্কবার্তা। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২২১৫)
ইসলাম শুধু পারিশ্রমিক প্রদানের কথা বলেনি, বরং শ্রমিকদের প্রতি মানবিক আচরণের নির্দেশও দিয়েছে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, অধীনস্থরা তোমাদের ভাই; তাদেরকে সেই খাবার দাও যা তোমরা নিজেরা খাও, এবং সেই পোশাক পরতে দাও যা তোমরা নিজেরা পরিধান করো। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৭৫)
এই শিক্ষা মালিক-শ্রমিক সম্পর্ককে একটি ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক সম্পর্কে রূপান্তরিত করে।
শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার একটি হৃদয়স্পর্শী উদাহরণ হলো সেই সাহাবির ঘটনা, যাঁর হাতে কঠোর পরিশ্রমের কারণে দাগ পড়ে গিয়েছিল। যখন রাসুল (সা.) তাঁর হাত দেখলেন এবং কারণ জানতে পারলেন, তখন তিনি সেই হাতকে ভালোবাসা ও সম্মানের সঙ্গে চুম্বন করেছিলেন। যা ইসলামে শ্রমিকের মর্যাদা কতটা উচ্চ তা নির্দেশ করে।
ইসলামের শ্রমনীতি একটি কার্যকর ও মানবিক সমাধান প্রদান করতে পারে। ইসলাম যে ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দেয়, তা যদি সমাজে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি ধর্মীয় কর্তব্য।
আহমাদ সাব্বির: আলেম ও লেখক
Published: প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ২০: ০০
Source: https://www.prothomalo.com/religion/islam/71nm0hd4l9
Comments
No comments yet
Be the first to share your thoughts!