যাচ্ছে বাজেট, আসছে বাজেট

প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট এযাবৎ সবচেয়ে বড় বাজেট হতে যাচ্ছে। বিএনপি সরকারের জন্য এটি শুধু একটি আর্থিক পরিকল্পনা নয়; বরং জনগণের কাছে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রদর্শনের একটি বড় সুযোগ। তবে বাস্তবতা হলো, বড় বাজেট ঘোষণা করা সহজ, বাস্তবায়ন করা কঠিন।
সরকার এমন এক সময়ে এই বাজেট প্রণয়ন করছে, যখন অর্থনীতি এখনো নানা চাপের মধ্যে রয়েছে। রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশার তুলনায় পিছিয়ে আছে, ব্যাংকিং খাত দুর্বল, বিনিয়োগে গতি নেই, বেসরকারি খাতের আস্থা পুরোপুরি ফিরে আসেনি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই রাজস্ব ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রায় ১৯ শতাংশ বড় বাজেট প্রস্তাব উচ্চাভিলাষী বটে।
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের ওপরই ন্যস্ত করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় যে শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই রাজস্ব বাড়ে না। অর্থনীতির গতিশীলতা, বিনিয়োগ পরিবেশ, কর প্রশাসনের দক্ষতা এবং করদাতার আস্থা—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।
বাংলাদেশের করব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, একই জনগোষ্ঠীর ওপর বারবার করের চাপ বাড়ানো হচ্ছে, কিন্তু করের আওতা যথেষ্ট সম্প্রসারিত হচ্ছে না। নতুন করদাতা সৃষ্টির পরিবর্তে বিদ্যমান করদাতাদের কাছ থেকেই বেশি রাজস্ব আদায়ের চেষ্টা করা হয়। ফলে ব্যবসা ও বিনিয়োগের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। আগামী বাজেটে যদি রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হয়, তাহলে করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, ডিজিটাল নজরদারি বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিনের বকেয়া কর আদায়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
বাজেটে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রাখা হয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে ব্যাংকঋণ, ব্যাংকবহির্ভূত ঋণ এবং বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যাংকিং খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সরকার যখন বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংকিং খাত থেকে সংগ্রহ করবে, তখন বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থ কোথা থেকে পাবেন? ইতিহাস বলে, অতিরিক্ত সরকারি ঋণ অনেক সময় বেসরকারি বিনিয়োগকে সংকুচিত করে।
সরকার আগামী অর্থবছরে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। লক্ষ্য দুটি প্রশংসনীয়। তবে বর্তমান বাস্তবতায় এগুলো অর্জন সহজ হবে না। আন্তর্জাতিক জ্বালানিবাজারের অস্থিরতা, সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা মূল্যস্ফীতি কমানোর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইতিমধ্যে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য সমন্বয়ের আলোচনা চলছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
অন্যদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং খাদ্য নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং শিক্ষা খাতও সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো হয়েছে, যা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির সম্প্রসারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জন্য কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনতে পারে। তবে সামাজিক সুরক্ষার প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন এবং স্বচ্ছ বাস্তবায়নের ওপর।
তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ ধারণার অন্তর্ভুক্তি বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য নতুন সংযোজন। তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ, সংস্কৃতি, উদ্ভাবনভিত্তিক ব্যবসা এবং সৃজনশীল শিল্পকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন উৎস হিসেবে বিবেচনা করা সময়ের দাবি। বাংলাদেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী কর্মক্ষম বয়সের। এই জনমিতিক সুবিধাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে না পারলে ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে।
তবে এই বাজেট নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়। নতুন সরকার এসেছে, নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব এসেছে, নতুন প্রতিশ্রুতি এসেছে; কিন্তু বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও কারিগরি কাঠামোর অধিকাংশ মানুষই পুরোনো। অর্থ বিভাগ, এনবিআর, পরিকল্পনা কমিশন কিংবা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরেই একই ব্যবস্থার অংশ।
আসন্ন বাজেটের মূল প্রশ্ন এর আকার নয়, এর বিশ্বাসযোগ্যতা। জনগণ জানতে চায় এই বাজেট কি তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, বিনিয়োগ বাড়াবে এবং অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনবে? যদি উত্তর ইতিবাচক হয়, তাহলে এটি একটি সফল বাজেট হিসেবে বিবেচিত হবে। অন্যথায় বড় অঙ্কের বাজেটও কেবল কাগজে-কলমের অর্জন হয়েই থেকে যাবে।
একটি বাজেট যাচ্ছে, আরেকটি বাজেট আসছে। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে শুধু বাজেটের অঙ্ক নয়; বাজেটের দর্শনও পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছে। সময় এখন নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার, নতুন চিন্তার সাহস দেখানোর। এমনকি পুরোনো কাঠামোর মধ্যে নতুন সম্ভাবনার পথ খুঁজে বের করার।
মামুন রশীদ অর্থনীতি বিশ্লেষক
Published: প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ১৩: ০৭
Source: https://www.prothomalo.com/opinion/column/o1hwmjljdh
Comments
No comments yet
Be the first to share your thoughts!