Home Articles জেলা

উৎপাদন কমেছে, বেড়েছে খরচ, কক্সবাজারের ৪২ হাজার লবণচাষি বিপাকে

আব্দুল কুদ্দুস May 26, 2026
উৎপাদন কমেছে, বেড়েছে খরচ, কক্সবাজারের ৪২ হাজার লবণচাষি বিপাকে

ঘন ঘন লোডশেডিং, ডিজেলসংকট, বৃষ্টিসহ নানা কারণে চলতি মৌসুমে কক্সবাজার জেলায় লবণ উৎপাদন কমেছে। একই সংকটের কারণে বেড়েছে উৎপাদন খরচ। চাষিদের দাবি, খরচের বাড়লেও লবণের দাম সেভাবে বাড়েনি। ফলে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁদের।

ঘন ঘন লোডশেডিং, ডিজেলসংকট, বৃষ্টিসহ নানা কারণে চলতি মৌসুমে কক্সবাজার জেলায় লবণ উৎপাদন কমেছে। একই সংকটের কারণে বেড়েছে উৎপাদন খরচ। চাষিদের দাবি, খরচ বাড়লেও লবণের দাম সেভাবে বাড়েনি। ফলে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁদের।

কক্সবাজার উপকূলে লবণ চাষের মৌসুম শুরু হয়েছে গত বছরের ১৫ নভেম্বর। এ বছরের ১৭ মে মৌসুম শেষ হয়েছে। তবে তাপপ্রবাহের কারণে এখনো লবণ উৎপাদন অব্যাহত রেখেছেন অনেক চাষি। কক্সবাজারে লবণচাষির সংখ্যা প্রায় ৪২ হাজার।

চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলার প্রায় ৮০ শতাংশ চাষির লবণ উৎপাদন জেনারেটর ও শ্যালো ইঞ্জিনচালিত পাম্পনির্ভর। পাম্পের সাহায্যে লোনাপানি লবণমাঠে আনা হয়। চলতি মৌসুমে পাম্পের জ্বালানিসংকটের কারণে একদিকে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। আবার অন্যদিকে বেশি দামে জ্বালানি কিনে পাম্পে ব্যবহার করতে হয়েছে চাষিদের। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। জ্বালানিসংকট ছাড়াও ঝড়-বৃষ্টিতে লবণ উৎপাদন কমেছে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক) ও লবণচাষি সমিতির তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে কক্সবাজার, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, চকরিয়া, ঈদগাঁও, টেকনাফ ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় মোট ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে লবণ চাষ হয়েছে। এসব এলাকায় প্রায় ২০ হাজারের মতো পাম্প ও জেনারেটর ব্যবহার করা হয়, যার ৯০ শতাংশই ডিজেলনির্ভর। প্রতিটি পাম্প চালাতে দৈনিক ৫ থেকে ৮ লিটার ডিজেল লাগে। তবে চলতি মৌসুমে ডিজেল পেতে চাষিদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। এখনো জ্বালানিসংকট পুরোপুরি কাটেনি।

মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার কয়েকজন চাষি জানান, ফিলিং স্টেশন থেকে ডিজেল কিনতে না পেরে স্থানীয় খুচরা দোকানগুলো থেকে বেশি দামে ডিজেল সংগ্রহ করতে হয়েছে তাঁদের। প্রতি লিটারে ৩০ থেকে ৫০ টাকা বেশি দাম দিতে হয়েছে। এ কারণে লবণের উৎপাদন খরচ ১৫-২০ শতাংশ বেড়েছে।

মহেশখালীর মাতারবাড়ী এলাকার চাষি শামসুল আলম। তিনি (৬৫) বলেন, আগে বাঁশ, বেত বা টিনের তৈরি ‘সেচনি’ ব্যবহার করে পানি তোলা হতো। এতে সময় বেশি লাগলেও খরচ হতো কম। এখন পাম্পের মাধ্যমে পানি তোলার কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। শামসুল আলম বলেন, ডিজেলসংকটের কারণে খরচ বাড়লেও লবণের দাম বাড়েনি। এখন যে দাম, তাতে প্রতি মণ লবণে ৮০ টাকা লোকসান দিতে হবে তাঁকে।

একই এলাকার চাষি আনসার উল্লাহ বলেন, ‘বৃষ্টিতে একদিনে ২৫০ মণ লবণ নষ্ট হয়ে গেছে। এরপর টানা কয়েক দিন উৎপাদন বন্ধ ছিল। এখন আবার শুরু করেছি, কিন্তু ঘনঘন লোডশেডিং ও ডিজেলসংকটে ঠিকভাবে কাজ চালাতে পারছি না।’

চকরিয়ার চাষি মমতাজ উদ্দিন বলেন, উৎপাদিত লবণ বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। মাঠে এক দামে বিক্রি হলেও বাজারে সেই লবণ কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হয়। এর পুরো লাভ দালাল সিন্ডিকেট নিয়ে যাচ্ছে, চাষিরা কিছু পাচ্ছেন না। লোকসানের কারণে এবার অনেক চাষি কোরবানি দিতে পারছেন না বলেও জানান তিনি।

টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের চাষি জালাল আহমদ বলেন, ‘মৌসুম শেষের দিকে ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কা বেশি থাকে। তবু এখনো উৎপাদন চলছে। এতেও চাষিদের ক্ষতি পোষানো সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।’

বিসিক কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া জানান, চলতি মৌসুমে ২৩ মে পর্যন্ত ১৯ লাখ ৩২ হাজার ৯২৪ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদিত হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৩ লাখ ১৮ হাজার ৭২৭ মেট্রিক টন কম। গত বছরে ১৭ মে পর্যন্ত লবণ উৎপাদিত হয়েছিল ২২ লাখ ৫১ হাজার ৬৫১ মেট্রিক টন। তিনি বলেন, ‘গত বছর ১৭ মে মৌসুম শেষ হলেও এবার তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকায় লবণ উৎপাদন চলছে। তবে গত রোববার বৃষ্টি হওয়ায় কিছু এলাকায় লবণ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। জ্বালানিসংকট, ঘন ঘন লোডশেডিং ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে এবার লবণ উৎপাদনের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।’

লবণ উন্নয়ন প্রকল্পের মাঠ পরিদর্শক মো. ইদ্রিস আলী বলেন, গত বছর ১৭ মে মৌসুমের শেষ দিন লবণ উৎপাদন করা হয়েছিল ২২ হাজার ৮২১ মেট্রিক টন। চলতি মৌসুমের ১৭ মে উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন। তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকলে আরও কিছুদিন লবণ উৎপাদন করা যাবে।

কোরবানির ঈদকে ঘিরে দাম কিছুটা বেড়েছে

লবণ উন্নয়ন প্রকল্পের মাঠ পরিদর্শক মো. ইদ্রিস আলী বলেন, কোরবানির পশু সংরক্ষণে সারা দেশে অন্তত এক লাখ মেট্রিক টন লবণ দরকার। বেশির ভাগ লবণের জোগান দিচ্ছে কক্সবাজার। কোরবানি উপলক্ষে মাঠপর্যায়ে লবণের দাম কিছুটা বেড়েছে। ইদ্রিস আলী বলেন, ‘সাত দিন আগে প্রতি মণ লবণ বিক্রি হয়েছে ২৭০-২৮০ টাকায়। তা এখন ৩৩০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।’

তবে চাষিদের দাবি, কোরবানিকে ঘিরে যে দাম বাড়ানো হয়েছে, তা দালাল চক্রের পকেটেই ঢুকছে। চৌফলদণ্ডীর চাষি কেরামত উল্লাহ বলেন, ‘চাষিদের কাছ থেকে প্রতি মণ লবণ ২৮০ টাকায় কিনে দালালেরা তা ৩৩০ টাকায় বিক্রি করছেন। চাষিরা লাভের মুখ দেখছেন না। একই লবণ আবার ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ৩৭০-৩৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’

চাষিদের অভিযোগ, এক কেজি লবণ মাঠে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬-৭ টাকায়। অথচ পরিশোধনের পর প্যাকেটজাত হয়ে বাজারে তা বিক্রি হয় ৪০ টাকার বেশি দামে। মূল্যের এ ব্যবধান অন্যায্য। কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য ও লবণচাষি আলমগীর মো. মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ বলেন, ‘এই অমানবিক মূল্য ব্যবধান বন্ধ না হলে চাষিরা টিকতে পারবে না।’

আলমগীর মো. মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেটের কারণে প্রান্তিক চাষিরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পাশাপাশি বিদেশ থেকে কম শুল্কে লবণ আমদানি দেশীয় শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’

Published: প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬, ০৬: ৩২

Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/1bq7ydfjcc

লবণ চাষ লবণ কক্সবাজার বিসিক চট্টগ্রাম বিভাগ

Comments

No comments yet

Be the first to share your thoughts!