ট্রাম্পের কূটনৈতিক ব্যর্থতার খেসারত দিচ্ছে বিশ্ব

পৃথিবীতে যেমন একদিকে দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক, বাস্তববাদী মধ্যস্থতাকারী ও পেশাদার কূটনীতিক আছেন, তেমনি আরেক দিকে আছেন কিছু নির্বোধ। যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের সূত্রে বা উসকানিতে শুরু হওয়া সংঘাতগুলোর যুদ্ধবিরতি ক্রমাগত ভেঙে পড়ছে, প্রাণ হারাচ্ছে ও বাস্তুচ্যুত হচ্ছে লাখ লাখ নিরীহ মানুষ, তখন ট্রাম্প আসলে কোন ঘরানার, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকে না। তিনি বড়াই করে বলেছিলেন, তিনি একাই চুক্তি করবেন এবং শান্তি ফিরিয়ে আনবেন। কিন্তু তিনি এর কোনোটাই পারেননি, বরং পরিস্থিতি আরও নাজুক করেছেন।
প্রিন্স মেটারনিকের বৃহৎ শক্তিগুলোর ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার নীতি কিংবা বেঞ্জামিন ডিসরেইলির বলকান অঞ্চলের ‘সম্মানজনক শান্তি’র মতো ঊনবিংশ শতাব্দীর কূটনীতির সেই সোনালি যুগ এখন ইতিহাস। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন নোবেলজয়ী শান্তিদূত জাতিসংঘের সাবেক প্রধান কফি আনান, ফিনল্যান্ডের কূটনীতিক মার্তি আহতিসারি কিংবা মার্কিন সিনেটর জর্জ মিচেল বিশ্বের নানা প্রান্তে অত্যন্ত জটিল সব বিরোধের সমাধান করছিলেন।
আজ যখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখন ডেসমন্ড টুটু, আন্দ্রেই শাখারভ বা ইতজাক রাবিনের মতো উত্তরসূরিরা কোথায়? বর্তমানে যুদ্ধবিরতিগুলো নিয়মিত ব্যর্থ হচ্ছে। লেবাননে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা এই সপ্তাহেই ভেস্তে গেছে। ইরানের মতো অন্যান্য জায়গায় প্রতিদিন যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করা হচ্ছে। সুদানে তো কোনো যুদ্ধবিরতিই নেই। কেন এই ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ বন্ধ করা এত কঠিন হয়ে পড়েছে?
আসলে ট্রাম্পের কূটনৈতিক রেকর্ড অত্যন্ত শোচনীয়। তিনি এক দিনের মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিলেও সেটা প্রায় পাঁচ বছর হতে চলল। তিনি প্রকাশ্যে রাশিয়ার পক্ষ নিয়ে এখন উল্টো চাপের মুখে থাকা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে বলেছেন যে তাঁর হাতে ‘কোনো কার্ড নেই’ এবং অস্ত্র সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন। তবে পুতিনের প্রতারণা করার প্রবণতা এবং ইউক্রেনের প্রতিরোধক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করে ট্রাম্প নিজেই নিজের চাল নষ্ট করেছেন।
গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর অবৈধভাবে হামলা চালানোর পর, ট্রাম্প এপ্রিল মাসে একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। অথচ তাঁর মূল উদ্দেশ্যগুলোর একটিও পূরণ হয়নি। হরমুজ প্রণালি নৌ চলাচলের জন্য এখনো প্রায় অচল। প্রতিদিন চুক্তি লঙ্ঘন হচ্ছে, দায়সারা ‘শান্তি আলোচনা’ স্থবির হয়ে আছে এবং বিশ্ব অর্থনীতি ধুঁকছে।
এখানেও ট্রাম্প পরিস্থিতিকে ছোট করে দেখেছেন, রাজনৈতিক বাস্তবতাকে পরিবর্তন করতে সামরিক শক্তির ক্ষমতাকে অতিরিক্ত মূল্যায়ন করেছেন, নিজের (অত্যন্ত খারাপ) প্রবৃত্তিকে অনুসরণ করেছেন, ইউরোপীয় মিত্রদের সরিয়ে রেখেছেন এবং একটি দ্রুত ও সহজ বিজয়ের বৃথা চেষ্টা করেছেন। এখন তিনি এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, বিদ্রোহী কংগ্রেস এবং ক্ষুব্ধ জনগণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন।
এদিকে গাজায় গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি ও ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তির পর ট্রাম্প যে বিশ্ব কাঁপানো সাফল্যের দাবি করেছিলেন, তা–ও ফাঁপা শোনাচ্ছে। হামাসকে নিরস্ত্র করার তাঁর ২০ দফার পরিকল্পনাটি দ্রুতই মুখ থুবড়ে পড়েছে। তাঁর ‘বোর্ড অব পিস’ ও গাজা পুনর্গঠনের জন্য পরিকল্পনাগুলোর কোনো গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। বাস্তবতা হলো ফিলিস্তিনিদের ক্রমবর্ধমান অবর্ণনীয় ভোগান্তি ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসন চলছেই।
ট্রাম্পের এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা একটি বৃহত্তর সমস্যারই প্রতিফলন। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইয়েমেন, মিয়ানমার ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি হয়েছে এবং ভেস্তেও গেছে। কিন্তু কোনো স্থায়ী সমাধান আসেনি। সুদানে মানবিক কারণে যুদ্ধ সাময়িক স্থগিত করা তো দূরের কথা, শত্রুতা থামানোর চুক্তি করাই এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে বিশ্বাসের চরম অভাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চরম জেদ এবং পূর্ণ বিজয়ের একটি ভুল ধারণা।
এই যুদ্ধগুলোর কোনোটাই সামরিক শক্তি দিয়ে শেষ করা সম্ভব নয়। কার কাছে কত বড় বোমা আছে, কে বিজয়ের ফাঁপা ঘোষণা দিতে পারল, বিষয়টা তেমন নয়। বিষয় হচ্ছে মানুষের জীবন। কেবল পেশাদার, সক্রিয়, দক্ষ ও অভিজ্ঞ কূটনীতিই শান্তির দুয়ার খুলতে পারে!
সাইমন টিসডাল দ্য গার্ডিয়ান–এর বৈদেশিক বিষয়াবলি–সংক্রান্ত ধারাভাষ্যকার
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
Published: প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ১৩: ২৩
Source: https://www.prothomalo.com/opinion/column/4sellcj8k0
Comments
No comments yet
Be the first to share your thoughts!