রবের আঙিনায় দাসের সমর্পণ

লাখো মানুষ একই রঙে, একই ঢঙে একই খোদার সমীপে হাজির হন। এই মহামিলনের পেছনে যে অন্তর্নিহিত চেতনা কাজ করে, তা হলো প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা এবং নিখাদ বিশ্বভ্রাতৃত্ব।
হজ কেবল একটি সফর নয়, এট মহান রবের সান্নিধ্য লাভের এক অনন্য আধ্যাত্মিক বিপ্লব। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে হজ এমন এক ইবাদত, যেখানে শারীরিক শ্রম, আর্থিক ত্যাগ এবং গভীর মানসিক নিমগ্নতার সমন্বয় ঘটে।
প্রতি বছর জিলহজ মাসে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ একই রঙে, একই ঢঙে একই খোদার সমীপে হাজির হন। এই মহামিলনের পেছনে যে অন্তর্নিহিত চেতনা কাজ করে, তা হলো প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা এবং নিখাদ বিশ্বভ্রাতৃত্ব।
হজের প্রথম ধাপ হলো ইহরাম। যখন একজন হজযাত্রী তার স্বাভাবিক বাহারি পোশাক ত্যাগ করে সেলাইবিহীন দুটি সাদা কাপড় পরিধান করেন, তখন মূলত তিনি নিজের সামাজিক পদমর্যাদা, সম্পদ আর অহংকারকেই বিসর্জন দেন।
ইহরামের এই সাদামাটা বেশ আমাদের মনে করিয়ে দেয় কবরের সফরের কথা। ইহরামের মাধ্যমে মানুষের ‘আমিত্ব’ ধুয়ে মুছে যায়। এখানে বাদশাহ আর ফকিরের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না; সবাই তখন এক আল্লাহর গোলাম। এই সাম্যই ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য।
ইহরাম বাঁধার পর থেকে হাজিদের কণ্ঠে সার্বক্ষণিক ধ্বনিত হয়— ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ (আমি হাজির হে আল্লাহ, আমি হাজির)। এই তালবিয়া হলো আল্লাহর আহ্বানে দাসের এক পরম আনুগত্যের ঘোষণা।
যখন একজন হাজি বারবার এই বাক্যটি পাঠ করেন, তখন তাঁর হৃদয়ে আল্লাহর মহত্ত্ব ও বড়ত্ব ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। এটি শুধু মুখে উচ্চারণ নয়, বরং অন্তর দিয়ে স্বীকার করা যে, জীবনের সকল নেয়ামত, রাজত্ব আর প্রশংসা একমাত্র আল্লাহরই।
হজের মূল রুকন বা প্রধান স্তম্ভ হলো ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘হজ হলো আরাফাহ’। এই বিস্তীর্ণ ময়দানে দাঁড়িয়ে হাজিরা যখন চোখের পানিতে নিজের গুনাহের জন্য তওবা করেন, তখন এক অলৌকিক পরিবেশ তৈরি হয়।
এটি যেন কেয়ামতের সেই বিচার দিবসের এক মহড়া। এখানে নেই কোনো গোত্রপ্রীতি, নেই ভাষার বিভেদ। আরবের মরুর প্রচণ্ড গরমেও তৃষ্ণা আর ক্লান্তি উপেক্ষা করে আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার যে আকুতি হাজিদের মধ্যে দেখা যায়, তা-ই হজের আধ্যাত্মিকতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।
হজের চেয়ে বড় আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্বের দৃশ্য আর কোথাও দেখা সম্ভব নয়। এশিয়ার মানুষ আফ্রিকার মানুষের সথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাওয়াফ করছে, সাদা বর্ণের মানুষ কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের সাথে একই দস্তরখানে বসে খাবার খাচ্ছে—এই দৃশ্য প্রমাণ করে ইসলামে বর্ণবাদ বা জাতীয়তাবাদের কোনো স্থান নেই।
কাবাঘরকে কেন্দ্র করে যখন লক্ষ লক্ষ মানুষের এই অবিরাম ঘূর্ণন চলতে থাকে, তখন মনে হয় পুরো পৃথিবী যেন একটি হৃদপিণ্ডে এসে মিশেছে। এই বিশ্বভ্রাতৃত্বই মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় শক্তি।
হজের আমলগুলোর মধ্যে সাফা-মারওয়া সায়ি করা এবং শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করার পেছনে রয়েছে এক মহান ত্যাগের ইতিহাস। মা হাজেরা (আ.)-এর সেই ক্লান্তিহীন ছোটাছুটি আর ইব্রাহিম (আ.)-এর শয়তানকে পরাস্ত করার ঘটনা আমাদের শেখায়—আল্লাহর পথে অবিচল থাকার জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হবে।
মিনায় পাথর নিক্ষেপের প্রতীকি অর্থ হলো নিজের ভেতরের কুপ্রবৃত্তি ও শয়তানি শক্তির িরুদ্ধে আজীবন যুদ্ধের শপথ নেওয়া।
হজ কেবল কয়েক দিনের অনুষ্ঠান নয়। হজ পালন করে এসে যদি মানুষের আচরণ ও চরিত্রে পরিবর্তন না আসে, তবে সেই হজের সুফল পূর্ণাঙ্গ হয় না। একজন ‘হাজি’ মানে এমন একজন মানুষ, যিনি নতুনভাবে জীবন শুরু করেছেন। হজের সেই ভ্রাতৃত্ববোধ আর আধ্যাত্মিক পবিত্রতা যেন সারা জীবন তাঁর কর্মে ও ব্যবহারে প্রতিফলিত হয়।
হজ আমাদের শেখায় আমরা সবাই এক আদমের সন্তান এবং আমাদের গন্তব্যও এক। আল্লাহর ঘরে ফিরে আসার এই আকুলতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর এই সাময়িক সফর শেষে আমাদের আসল ঠিকানায় ফিরতে হবে।
হজের এই মূল চেতনা—অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং মানুষের প্রতি ভ্রাতৃত্ববোধ—যদি আমরা ধারণ করতে পারি, তবেই আমাদের সমাজ ও বিশ্ব হবে শান্তিময়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হজের এই আধ্যাত্মিক নূর দ্বারা জীবনকে আলোকিত করার তৌফিক দিন।
মুফতি সাইফুল ইসলাম: খতিব, মসজিদ-উত তাকওয়া সোসাইটি, ধানমণ্ডি
Published: প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬, ২২: ৩০
Source: https://www.prothomalo.com/religion/islam/xmcpygrisx
Comments
No comments yet
Be the first to share your thoughts!