অন্ধকারকে কেন ভয় পায় মানুষ
জাহিদ হোসাইন খান
May 04, 2026

অন্ধকারের প্রতি ভয় কোনো মানসিক দুর্বলতা নয়। এটি মানুষের টিকে থাকার জন্য তৈরি হওয়া এক প্রাচীন সুরক্ষাকবচ।
অন্ধকার দেখলে আমাদের মনে অজানা সব ভয় দানা বাঁধে। আধুনিক যুগের আলোকিত শহরে বাস করেও আমরা অন্ধকারের সেই আদিম আতঙ্ককে পুরোপুরি ভুলতে পারছি না। বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের মতে, অন্ধকারের প্রতি এই ভয় কোনো মানসিক দুর্বলতা নয়। এটি মানুষের টিকে থাকার জন্য তৈরি হওয়া এক প্রাচীন সুরক্ষাকবচ। সাম্প্রতিক গবেষণার আলোকে বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করেছেন, কীভাবে আমাদের মস্তিষ্ক অন্ধকারের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে এবং কেন এই প্রাচীন প্রবৃত্তি আজও মানুষের আচরণ ও আবেগকে প্রভাবিত করছে। বিবর্তনীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে, ভয় আসলে কোনো ত্রুটি নয়। এটি একটি খাপ খাইয়ে নেওয়ার কৌশল। মানুষ এমন এক পরিবেশে বিবর্তিত হয়েছে, যেখানে রাতের বেলা বিপদের ঝুঁকি অনেক বেশি ছিল। দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে অন্ধকারে মানুষ আসন্ন বিপদ দেখতে পেত না, যা তাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে বাধ্য করত। হিউম্যান ইমোশনাল ইভালুশন অব অ্যানসেস্ট্রাল অ্যান্ড মডার্ন থ্রেটস শীর্ষক একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, আমাদের বর্তমান অধিকাংশ ভয়ের মূলে রয়েছে এমন কিছু রক্ষণাত্মক কৌশল। এটি প্রাকৃতিক নির্বাচনপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের ক্ষতি থেকে বাঁচানোর জন্য তৈরি হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবেশে বিপদ কমে যাওয়ার অনেক পরও এই রক্ষণাত্মক কৌশলগুলো আমাদের মস্তিষ্কে টিকে থাকে। বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ করেছেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে যখন দৃশ্যমানতা কম থাকে, মানুষ অনেক বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। কারণ, বিপদের সামান্যতম সম্ভাবনা থাকলেও সতর্ক থাকাটাই ছিল আদিম মানুষের টিকে থাকার মূলমন্ত্র। অন্ধকারের প্রতি আমাদের মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া দিনের বেলা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এক্সপেরিয়েন্সিং কমপ্লিট ডার্কনেস অন ব্রেইনস নামক একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, মস্তিষ্ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেয়ে বিপদের প্যাটার্ন বা সংকেত শনাক্ত করতে অনেক বেশি দক্ষ। যখন আমাদের দৃষ্টিশক্তি কোনো তথ্য সরবরাহ করতে পারে না, তখন মস্তিষ্ক নিজেই সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্ক প্রায়ই সবচেয়ে খারাপ বা ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা কল্পনা করে নেয়। এ ছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে, অন্ধকারে মানুষের শ্রবণশক্তি অত্যন্ত তীব্র হয়ে ওঠে। দৃশ্যমান তথ্যের অভাবে মস্তিষ্ক শব্দের প্রতি অতিসংবেদনশীল হয়ে পড়ে, যা উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়। ���িরাপদ পরিবেশে বাস করেও অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ অন্ধকারে অস্বস্তি বা ভয় অনুভব করেন। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এটি আমাদের প্রাগৈতিহাসিক পূর্বপুরুষদের টিকে থাকার প্রবৃত্তির সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির একটি অসামঞ্জস্যতা। আমরা জন্মগতভাবেই এমন কিছু পরিস্থিতির প্রতি ভীত থাকি। এ ছাড়া সাংস্কৃতিক প্রভাবও এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। রূপকথা থেকে শুরু করে আধুনিক মিডিয়া বা সিনেমা—সব জায়গাতেই অন্ধকারকে অশুভ বা বিপজ্জনক হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়, যা এই ভয়কে আরও বাড়িয়ে দেয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, অন্ধকারের ভয়কে জয় করা সম্ভব। যখন একজন ব্যক্তি বুঝতে পারেন যে তাঁর ভয়টি আসলে একটি ভিত্তিহীন রক্ষণাত্মক প্রতিক্রিয়ামাত্র, তখন এটি মোকাবিলা করা সহজ হয়। জার্নাল অব অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডারসে প্রকাশিত তথ্যমতে, নিয়ন্ত্রিতভাবে ভীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়া উদ্বেগের প্রতিক্রিয়া কমিয়ে দেয়। সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়াPublished: প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬, ০৯: ৪০
Source: https://www.prothomalo.com/technology/science/2g6s9qf3vm
বিজ্ঞান
মানসিক স্বাস্থ্য
মন
মানুষ
Comments
No comments yet
Be the first to share your thoughts!