Home Articles ইসলাম

এতিম কেন বিশেষ যত্নের দাবিদার

মনযূরুল হক May 05, 2026
এতিম কেন বিশেষ যত্নের দাবিদার

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসুলকে (সা.) সম্বোধন করে বলেছেন, ‘তিনি কি আপনাকে এতিম হিসেবে পাননি? অতঃপর তিনি আশ্রয় দিয়েছেন।’ (সুরা দুহা, আয়াত: ৬) এই আয়াতের ধারাবাহিকতায় পরবর্তী নির্দেশ হলো, ‘সুতরাং আপনি এতিমের প্রতি কঠোর হবেন না।’ (সুরা দুহা, আয়াত: ৯) মুজাহিদ (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, এতিমকে তুচ্ছজ্ঞান করো না। এতিম কেন বিশেষ যত্নের দাবিদার? কারণ, পৃথিবীতে মহান আল্লাহ ছাড়া তার কোনো সাহায্যকারী নেই। তাই তার প্রতি অবিচারকারীর জন্য শাস্তির বিধানও অত্যন্ত কঠোর করা হয়েছে। (আল-কুরতুবি, আল-জামি লি আহকামিল কুরআন, ২০/১০০, কায়রো) কাতাদা (রহ.) এতিমের প্রতি মমতার গভীরতা বোঝাতে গিয়ে বলেছেন, ‘তুমি এতিমের জন্য একজন দয়ালু পিতার মতো হয়ে যাও।’ আরবি ভাষায় ‘ইউতাম’ শব্দের অর্থ একাকী বা বিচ্ছিন্ন থাকা। শরিয়তের পরিভাষায় যে শিশুর পিতা মারা গেছে, সে-ই এতিম। মানুষের ক্ষেত্রে পিতা মারা গেলে শিশুটি এতিম হয়, আর পশুর ক্ষেত্রে মা মারা গেলে তাকে ‘ইউতাম’ বলা হয়। ইবনে বাররি বলেন, যার বাবা মারা যায় সে ‘এতিম’, যার মা মারা যায় সে ‘আজিয়ু’ আর যার বাবা-মা উভয়ই মারা যায় সে ‘লাতিম’। তবে ইসলামি বিধান অনুযায়ী, শিশুটি সাবালক হওয়ার পর তার থেকে এতিম নাম ঘুচে যায়। (ইবনে মনজুর, লিসানুল আরব, ১২/৬৪৫, দারু সাদির, বৈরুত) মুহাম্মদ (সা.) জন্মেছিলেন এতিম হয়ে। এটি পৃথিবীর সমস্ত এতিমের জন্য অনেক বড় সম্মানের এবং সান্ত্বনার বিষয়। তিনি মায়ের গর্ভে থাকাকালীনই পিতাকে হারান। ছয় বছর বয়সে হারান মাকে এবং আট বছর বয়সে দাদাকে। এরপর তাঁর চাচা আবু তালিবের পরম মমতায় তিনি বড় হন। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/১০১, দারু সাদির, বৈরুত) নবীজিকে আল্লাহ–তাআলা এতিম হিসেবে বড় করার পেছনে বড় রহস্য রয়েছে। এর ফলে ভ্রান্তপন্থীরা এই কথা বলার সুযোগ পায়নি যে মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বাবা বা দাদার নির্দেশনায় এই ধর্ম প্রচার করছেন। বরং শৈশব থেকেই তিনি কেবল আল্লাহর সরাসরি তত্ত্বাবধানে বড় হয়েছেন। এ ছাড়া বারবার আপনজন হারানোর কষ্ট তাঁকে অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিল। (আল-বুতি, ফিকহুস সিরাহ, পৃষ্ঠা: ৫৪, দারুল ফিকর, দামেস্ক) এতিমের প্রতি দয়া করার অন্যতম প্রধান দিক হলো তার সম্পদ রক্ষা করা। মহান আল্লাহ একে ‘দশটি অসিয়তে’র অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তোমরা এতিমের সম্পদের কাছেও যেয়ো না, তবে উৎকৃষ্ট পন্থায় যেতে পারো, যতক্ষণ না সে তার শক্তিমত্তা (সাবালকত্ব) অর্জন করে।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১৫২) এতিমের সম্পদ আত্মসাৎকারী সম্পর্কে কোরআন সতর্ক করেছে, ‘নিশ্চয়ই যারা এতিমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে, তারা তাদের পেটে আগুনই ভক্ষণ করে; আর অচিরেই তারা প্রজ্বলিত আগুনে প্রবেশ করবে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১০) সাহাবি ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, যখন এতিমের সম্পদ নিয়ে এই আয়াতগুলো নাজিল হলো, তখন সাহাবিরা এতটাই সতর্ক হয়ে গেলেন যে, এতিমের খাবার ও পানি আলাদা করে ফেলতেন। যদি খাবার বেঁচে যেত, তবুও, নষ্ট হওয়ার ভয় থাকলেও তাঁরা তা খেতেন না। এরপর আল্লাহ–তাআলা সুরা বাকারার ২২০ নম্বর আয়াত নাজিল করে তাদের খাবার ও জীবনযাত্রায় একত্রে চলার অনুমতি দেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২২০) এতিমকে আশ্রয় দেওয়া এবং লালন-পালন করার পুরস্কার হিসেবে রাসুল (সা.) জান্নাতে নিজের সান্নিধ্যের সুসংবাদ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি এবং এতিম লালন-পালনকারী ব্যক্তি জান্নাতে এই দুটির মতো থাকব।’ এই বলে তিনি শাহাদাত ও মধ্যমা আঙুল দিয়ে ইঙ্গিত করেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৮৩) কেবল আহার বা পোশাক নয়, এতিমের মাথায় হাত বুলানোও ওয়াবের কাজ। জনৈক ব্যক্তি নবীজির কাছে এসে তাঁর হৃদয়ের কঠোরতার কথা জানালে তিনি বলেন, ‘তুমি যদি তোমার অন্তর নরম করতে চাও, তবে মিসকিনকে খাবার দাও এবং এতিমের মাথায় হাত বুলাও।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৭৫৭৬) আজকের সমাজে এক ধরনের ‘বিশেষ এতিম’ দেখা যায়, যাদের বাবা-মা বেঁচে থাকলেও সন্তানের জন্য সময় নেই। কর্মব্যস্ততা বা অর্থ উপার্জনের নেশায় বাবা-মা যখন সন্তানকে কেবল গৃহকর্মী বা ইন্টারনেটের হাতে ছেড়ে দেন, তখন সেই শিশুটি নৈতিকভাবে পিতৃহীন হয়ে পড়ে। রাসুল (সা.) এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই একেকজন দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই নিজ অধীনস্থদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৯৩) এতিমের সম্পদ রক্ষা, তাকে পারিবারিক মমতা দেওয়া এবং সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা সমাজের সামষ্টিক দায়িত্ব। একটি সমৃদ্ধ ও মানবিক সমাজ গড়তে হলে এতিমদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

Published: প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬, ০৭: ০০

Source: https://www.prothomalo.com/religion/islam/xv32197ncb

ইসলামের সৌন্দর্য হজরত মুহাম্মদ (সা.) এতিমখানা হাদিস যত্ন সিরাত মনযূরুল হক

Comments

No comments yet

Be the first to share your thoughts!