চম্পার দায়িত্ব কোরবানির মাংস পৌঁছে দেওয়া

অভিনয়জীবনের স্মরণীয় ঈদগুলোর একটি কেটেছিল ভারতের ওডিশায়। সঠিক সময়টা মনে না থাকলেও নব্বই দশকের মাঝামাঝি, তখন কাজ করছিলাম সন্দীপ রায়ের ‘টার্গেট’ সিনেমায়।
কোরবানির ঈদে আমাদের বাসায় গরু–ছাগল—দুটোই কোরবানি হতো। হাট থেকে কিনে আনার পর আমি গরু-ছাগল খুব আদর করতাম। আমি তিন বোনের পরিবারে বড় হয়েছি। বড় বোন সুচন্দা ও ববিতার আদরের ছিলাম। পর্দার তারকা হলেও ঘরের কাজে কখনো ছাড় পাইনি। তিন বোনই সিনেমার কাজের বাইরে ঘরের কাজে সহযোগিতা করতাম।
রান্নাবান্না থেকে শুরু করে সংসারের নানা কাজ করতাম। ঈদ এলে আমার ওপর পড়ত মাংস বণ্টনের দায়িত্ব। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী থেকে শুরু করে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে কোরবানির মাংস পৌঁছে দেওয়ার কাজটি আমাকে করতে হতো। বিয়ের পর নিজের সংসারেও সেই দায়িত্বই পালন করেছি।
শৈশবের ঈদের সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতিগুলোর একটি হলো নতুন জামা, মাথার ফিতা, চুড়ি আর জুতা ঘিরে। বাবা নতুন জামা-জুতা কিনে না দিলে আমার ঈদই পূর্ণ হতো না। আমি বলতাম, নতুন জামা, মাথার ফিতা, হাতের চুড়ি আর নতুন জুতা আমার চাই-ই চাই। একদম নাছোড়বান্দা ছিলাম। কোরবানির ঈদও আমার জন্য তিন দিন চলত। তাই তিন দিনের জামাকাপড় চাই। রোজার ঈদ অবশ্য আরও বেশি, পাঁচ দিন। ঈদের আগের রাতে জামা বালিশের নিচে আর জুতা পাশে রেখে ঘুমাতাম। তারপর একটু পরপর ঘুম থেকে উঠে দেখতাম, সব ঠিক আছে কি না। জামা আছে তো, জুতা আছে তো, ফিতা আছে তো—এসব দেখেই আবার ঘুমাতাম। কখন ভোর হবে, সকাল হচ্ছে না কেন—অস্থির থাকতাম।
অভিনয়জীবনে ঈদ মানেই ছিল নতুন সিনেমা মুক্তির আনন্দ। ঈদের দিন হলে না গেলেও পরদিন বোরকা পরে দর্শকের ভিড়ে বসে নিজের সিনেমা দেখতাম। কখনো নাজ, মধুমিতা কিংবা মিরপুরের সনি সিনেমা হল—প্রতিটিতে আলাদা স্মৃতি আছে আমার। দর্শক কী বলছেন, সেটা মন দিয়ে শুনতাম। কেউ প্রশংসা করতেন, কেউ সমালোচনা—সবই শুনতাম। তবে ঈদুল আজহার এক দিন পর সিনেমা দেখতে যেতাম। বেশি সিনেমা দেখা হয়েছে মধুমিতায়, ওটার পরিবেশ বেশ ভালো লাগত।
অভিনয়জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঈদগুলোর একটি কেটেছিল ভারতের ওডিশায়। সঠিক সময়টা মনে না থাকলেও নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি, আমি তখন কাজ করছিলাম সন্দীপ রায় পরিচালিত ‘টার্গেট’ সিনেমায়। ছবিতে আমার সহশিল্পী ছিলেন ওম পুরী। কোরবানির ঈদের দিনও চলছিল শুটিং। ইউনিটের সবাই এত আন্তরিক ছিলেন যে আমাকে কখনোই বিদেশে আছি, এমনটা বুঝতে দেননি। শুটিং পেছানোর সুযোগ থাকলেও আমি নিজেই কাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমি বলেছিলাম, ঈদ তো জীবনে আবার আসবে। কিন্তু এত মানুষের শিডিউল একবার নষ্ট হলে সেটি মেলানো কঠিন। তাই কাজটাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল। তাই আমি ঈদের দিনেও কাজ করেছি।
আমার কাছে কোরবানির ঈদ শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি জীবনের গভীর এক শিক্ষা—ত্যাগ, ভালোবাসা আর ভাগাভাগির শিক্ষা। এই ঈদ আমাদের শেখায়, মানুষ তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ও মূল্যবান জিনিসও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ করতে পারেন। সেই ত্যাগের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আত্মশুদ্ধি, বিনয় এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার এক সুন্দর বার্তা। কোরবানির মাধ্যমে শুধু একটি পশু উৎসর্গ হয় না; বরং মানুষের ভেতরের অহংকার, লোভ ও স্বার্থপরতাও ত্যাগের একটি প্রতীকী চর্চায় পরিণত হয়। আর সেই ত্যাগের আনন্দই শেষ পর্যন্ত সমাজে সহমর্মিতা, ভাগাভাগি আর মানবিকতার সম্পর্ককে আরও সুন্দর করে তোলে।
এবারের ঈদুল আজহা আমার জীবনে বিশেষ আনন্দ নিয়ে এসেছে। বহুদিনের স্বপ্ন ছিল হজ পালন করার। নানা কারণে কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েও যাওয়া হয়নি। অবশেষে এবার সৌদি আরবে পবিত্র হজ পালন করছি। পরিবারের সদস্যরাও আমার সঙ্গে আছে। মনে হচ্ছে, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ঈদটা এবারই কাটছে। পরিবারের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে অন্য রকম এক অনুভূতির মধ্যে আছি।
অনুলিখন: মনজুর কাদের
Published: আপডেট: ২৮ মে ২০২৬, ০৫: ০৮
Source: https://www.prothomalo.com/entertainment/dhallywood/j5hnqf7niu
মন্তব্য
এখনো কোন মন্তব্য নেই
আপনার চিন্তা শেয়ার করতে প্রথম হতে!