টোকিও থেকে ঢাকায় কিনোকুনিয়া, কী আছে এই বইয়ের দোকানে?

ভিন্ন ডিজাইনের চমৎকার সব র্যাকে থরে-থরে সাজানো বই। কোন র্যাকের কোন অংশে কী ধরনের বই রাখা সে বিষয়ে ইংরেজিতে স্পষ্টভাবে লেখা। কোথাও ফিকশন, নন-ফিকশন রাখা, পাশেই মিলছে সামাজিক বিজ্ঞান, অর্থনীতি, ব্যবসা, দর্শন সংক্রান্ত বই।
আছে ফ্যান্টাসি, রান্না, আত্মজীবনী, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, কমিকসের মত ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের বই। বাংলা বই ছাড়াও পাওয়া যাচ্ছে এ সময়ে বিশ্বের আলোচিত লেখকদের লেখা বিভিন্ন ভাষার গ্রন্থ।
‘পিনপতন নীরবতার’ মধ্যেই কেউ কেউ সেসব বই উল্টেপাল্টে দেখছিলেন। কারো হাতে দেখা গেল হারুকি মুরাকামির বই। কারও হাতে কাফকা, কেউ বা মিলান কুন্ডেরার বইয়ে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন চটজলদি। কারও আবার আগ্রহ জাপানিজ মাঙ্গায়।
এর বাইরে রয়েছে বাহারি স্টেশনারি সামগ্রী, অরিগামি সেট, বনসাই গাছ তৈরির কিট, স্কেচ বুক, ডায়েরি, প্যাড, যোগব্যায়ামের নানা সরঞ্জামসহ হরেক রকম পণ্য। স্বল্প পরিসরে হলেও রয়েছে বসে বই পড়ার জায়গা।
না, এ দৃশ্য বিদেশি কোনো বইয়ের দোকানের নয়; ঢাকার উত্তরার সেন্টারপয়েন্টে শতবর্ষী জাপানি চেইন বুকশপ ‘বুকস কিনোকুনিয়া’র। পূর্ব এশিয়ার দেশ জাপানের জনপ্রিয় এই বুক চেইনটি গত ১৯ জুন বাংলাদেশে তাদের শাখা খুলেছে।
১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বুকস কিনোকুনিয়া বুক চেইন পরিচালনা করছে জাপানের কিনোকুনিয়া কোম্পানি লিমিটেড। এ নামের অর্থ হল ‘কি প্রদেশের বইয়ের দোকান’। কোম্পানির প্রধান কার্যালয় জাপানের রাজধানী টোকিওর মেগুরোকুতে। একই শহরের সিনজোকুতে বুকস কিনোকুনিয়ার প্রধান স্টোর।
জাপান ছাড়াও সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তাইওয়ান, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে এই বুক চেইনের ৪০টির বেশি শাখা রয়েছে।
মূলত আন্তর্জাতিক প্রকাশনার নতুন বই, সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, শিল্পকলা, একাডেমিক গবেষণা, শিশুতোষ বই এবং জাপানি মাঙ্গার সমৃদ্ধ সংগ্রহের জন্য বুকস কিনোকুনিয়া বিশেষভাবে পরিচিত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে পথ চলার এই ক’দিনের মধ্যেই উৎসুক ক্রেতা পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে দোকানটি। উদ্বোধনের দিন ও পরদিন রেজিট্রেশন করে ঢোকা লাগলেও এখন বুকস কিনোকুনিয়া সবার জন্য উন্মুক্ত।
গত মঙ্গলবার বুকস কিনোকুনিয়ায় গিয়ে দেখা যায়, সপরিবারের বা একা ঘুরতে এসেছেলিনে অনেকে। তাদের কেউ কেউ বই কিনেছেন, কেউ এসেছেন শুধুই দেখতে।
ঢাকার বুকস কিনোকুনিয়ায় রয়েছে ফিকশন, নন-ফিকশন, ভ্রমণ, রহস্য, ভাষা শিক্ষা, দর্শন, জাপানিজ মাঙ্গা, সাহিত্য, ফ্যান্টাসি, সামাজিক বিজ্ঞান, অর্থনীতি, বিনিয়োগ, আত্মজীবনী, ব্যবসা, লাইট নভেলসহ নানা বিভাগের প্রায় ৪০ হাজার বইয়ের ভাণ্ডার।
এত বিষয়ের মধ্যে কোন ঘরানার বইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি? বুকস কিনোকুনিয়ার মার্চেন্ডাইজার সাজেদুল ইসলাম বললেন, “এখানে সব ধরনের বই আমরা দেখতে পাচ্ছি, মানে মানুষের ভালোই সাড়া পাচ্ছি। বিশেষ করে সেলফ হেল্প, তারপর ফিকশন, নন-ফিকশন, জাপানিজ মাঙ্গা এগুলো নিয়ে মানুষের আগ্রহ বেশি।
“ছুটির দিনগুলোতে অনেক বেশি ভিড় হয়। তবে অন্যান্য দিনে ভিড় তুলনামূলক কম। উদ্বোধনের প্রথম কয়েকদিন বেশ ভিড় ছিল। এখন রেগুলার দিনে তো মানুষের কর্মব্যস্ততা থাকে।”
ঢাকায় যে আরো দুই একটি চেইন বুকশপ আছে, সেগুলো থেকে বুকস কিনোকুনিয়া কীভাবে আলাদা? সাজেদুল বলেন, “আমি এর আগে আরো একটা বইয়ের কোম্পানিতে কাজ করেছি, সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, কিনোকুনিয়ার কালেকশন এবং অথেন্টিসিটি, মানে অরিজিনাল বুকস, প্রিমিয়াম কোয়ালিটি জন্য এটা একটু আলাদা অন্যদের থেকে।
“কিনোকুনিয়ার অধিকাংশ বইয়ের বাইন্ডিং, তারপর কাগজের মান ভালো। সবমিলিয়ে কিনোকুনিয়া ব্যতিক্রম।”
সাজেদুল ইসলাম জানান, কিনোকুনিয়া একসময় মূলত কাঠ ও কয়লার ব্যবসা করত। ১৯২৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর জাপানে ৮ মাত্রার গ্রেট কান্তো ভূমিকম্পের পর সেই ব্যবসা পশ্চিম দিকে শিনজুকুর একটি নতুন জায়গায় স্থানান্তর করা হয়। সেখানে কোম্পানির সাবেক সভাপতি মোইচি তানাবে কিনোকুনিয়াকে একটি বইয়ের দোকানে রূপান্তর করেন।
এরপর ১৯২৭ সালের জানুয়ারিতে মাত্র ৫ জন কর্মচারী নিয়ে শুরু হয় বুক কিনোকুনিয়ার যাত্রা। দোকানটির দ্বিতীয় তলায় ছিল শিল্পকলা গ্যালারি। কারণ তানাবে মনে করতেন, বইয়ের দোকানের কাজ শুধু বই বিক্রি নয়, বরং বইয়ের সঙ্গে শিল্প ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটানো।
কিনোকুনিয়ার মূল ভবনটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৫ সালের মে মাসে এক বিমান হামলার সময় আগুনে পুড়ে যায়। তবে দ্রুতই সে বছরের ডিসেম্বর মাসে এটি আবার চালু হয়। পরে জাপানের বিভিন্ন স্থানে কিনোকুনিয়ার আরও কিছু শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
১৯৬৯ সালে কিনোকুনিয়ার প্রথম বিদেশ শাখা চালু হয় যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে। যুক্তরাষ্ট্রর লস অ্যাঞ্জেলেস ও নিউ ইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরে আরও কয়েকটি দোকান চালু করেছে কিনোকুনিয়া কোম্পানি লিমিটেড। তাদের সবশেষ চালু হওয়া শাখা বাংলাদেশে।
ঢাকায় ওই শাখা চালু হওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বইপ্রেমিদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে। লেখক ও সমালোচক ইমরুল হাসান ফেইসবুকে লিখেছেন, তিনি কিনোকুনিয়ায় ঘুরতে গিয়েছিলেন, বইও কিনেছেন।
তবে স্থানীয় প্রকাশনীর বাংলা বই কম থাকায় কিছুটা হতাশ ইমরুল। তিনি লিখেছেন, “কিনোকুনিয়ায় ইন্ডিয়ান বাংলার বই আছে, কিন্তু বাংলাদেশি কোনো পাবলিশারের বই দেখলাম না! অবশ্য এখনো বাংলা বই মানেই তো ইন্ডিয়ান বাংলা বই!”
কবি ও সমালোচক ব্রাত্য রাইসু নিজের ফেইসবুকে কিনোকুনিয়ার যাত্রা নিয়ে একটি লেখা পোস্ট করেছেন। তিনি লেখেন, “ই-বুক, অনলাইন বিক্রি আর ই-কমার্সের চাপে সারা পৃথিবীতেই ভৌত বইয়ের দোকান কঠিন সময় পার করছে। মানুষ আগের মত শুধু দোকানে গিয়ে বই কেনে না। কয়েক ক্লিকেই বই ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের ধাক্কা কিনোকুনিয়াও অনুভব করেছে।
“আর এই ধাক্কাটা সবচেয়ে স্পষ্ট তাদের নিজের ঘরেই। ২০২৬ সালের মার্চের শেষে জাপানে বইয়ের দোকানের সংখ্যা নেমে এসেছে ৯,৯৯৩-এ। ১৯৯৪ সালে এই হিসাব রাখা শুরুর পর এই প্রথম সংখ্যাটা দশ হাজারের নিচে। গত অর্থবছরে গোটা দেশে নতুন দোকান খুলেছে মোটে ১০২টা, বিপরীতে বন্ধ হয়েছে ৪৯৯টা। ১৯৯৮ সালের তুঙ্গে যেখানে দোকান ছিল ২৪ হাজারের বেশি, আজ টিকে আছে তার ৪০ শতাংশের সামান্য বেশি।
“অর্থাৎ যে দেশের মাটিতে কিনোকুনিয়ার জন্ম, সেখানেই ছাপা বইয়ের দোকান দ্রুত মিলিয়ে যাচ্ছে। জাপানের বহু শহর ও মফস্বলে এখন এমন প্রজন্ম বড় হচ্ছে, যাদের দৈনন্দিন জীবনে কোনো স্থানীয় বইয়ের দোকানই নেই। এই পটভূমিতে দাঁড়িয়ে কিনোকুনিয়ার টিকে থাকার কৌশলটা আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে। কিনোকুনিয়ার গল্প শুধু সাফল্যের গল্প নয়। সময়ের সঙ্গে তাদেরও বদলাতে হয়েছে, লড়তে হয়েছে।”
কিনোকুনিয়ায় ঘুরতে আসা আরো অনেকেই বাংলাদেশি বাংলা বই বেশি না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেন। আবার কারো হতাশা দাম নিয়ে।
বরিশাল থেকে নিজের স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে এসেছিলেন মো. আরিফ নামের এক ব্যক্তি। ছুটিতে ঢাকায় এসে পরিবারের সবাই মিলে মঙ্গলবার বই দেখছিলেন ঘুরে-ঘুরে। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অন্যান্য বুক চেইন শপগুলো থেকে এখানে অনেক ভ্যারাইটি আছে এবং অনেক সাজানো গোছানো।
“যারা মাত্র পড়া শুরু করেছেন তাদের জন্য কোন বিভাগের বইটা কোথায় আছে সেটা খুঁজে পাওয়া সহজ হবে। এটা তো অন্য জায়গায় এত সহজ না। এখানে বইগুলোর কাগজ ও বাঁধাই অনেক উন্নতমানের।”
ভারতীয় বাঙালি কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর একটি কবিতার বই উল্টেপাল্টে দেখছিলেন সেহেলী ইসলাম নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, “ভাস্কর চক্রবর্তীর শ্রেষ্ঠ কবিতা বইটার দাম এখানে ৬০০ টাকা। কিন্তু এই একই বই বাইরে থেকে ৩০০ টাকায় কেনা সম্ভব অনায়াসে। মানে দামটা আরেকটু যৌক্তিক হতে পারত। দেশি বইও বেশি নাই।”
দেকানে ঘুরতে আসা প্রবীণ এক নারী বললেন, “আমি বহুবছর ধরে বই পড়ি। এখানের বইগুলোর ছাপা আর কাগজের মান তুলনামূলক ভালো। তবে বাংলাদেশের প্রকাশনীগুলোরও অনেক প্রিমিয়াম বাঁধাইয়ের বই রয়েছে।
“কিন্তু দেশি বইয়ের সংগ্রহ অনেক কম এখানে। এটা আমাকে হতাশ করেছে। পাশপাশি বাংলাদেশের বাজারের অবস্থা বিবেচনায় দাম কিছুটা কম হলে রা বেশ ভালো করবে বলে আমার ধারণা।”
Published: 03 Jul 2026, 12:50 PM
Comments
No comments yet
Be the first to share your thoughts!