Home Articles জেলা

‘সংসার চলে না গো বাপু, ৪০০ থেকে ৫০০ টেহায় এহন আর কিছুই হয় না’

আব্দুল আজিজ May 05, 2026
‘সংসার চলে না গো বাপু, ৪০০ থেকে ৫০০ টেহায় এহন আর কিছুই হয় না’

জামালপুরের ফুটপাতের কলা বিক্রেতা আবদুল মালেকের আয় কমেছে এবং সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। পাইকারি বাজার থেকে বাকিতে কলা নিয়ে বসছেন, কিন্তু বিক্রিও কম।

শহরের কর্মব্যস্ততা শুরু হয়েছে সবে। কেউ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলছেন, কেউ হেঁটে কিংবা যানবাহনে নিজেদের কর্মস্থলে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে ব্যস্ত সড়কের পাশে ফুটপাতের এক কোণে বসে আছেন ৫৫ বছর বয়সী আবদুল মালেক। সামনে দুটি বাঁশের ঝুড়িতে স্তরে স্তরে সাজানো আছে কলা। ক্রেতার অপেক্ষায় তাঁর চোখ বারবার রাস্তার দিকে যাচ্ছিল, সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘ হচ্ছিল সেই অপেক্ষা। কিছুদিন আগেও রোজ ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করতেন বলে দাবি করেন আবদুল মালেক। কিন্তু এখন তা নেমে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে চলে এসেছে। এর আগে কলা বিক্রির আয়ে কোনোরকমে সংসার চললেও এখন আর তা হচ্ছে না। তাই আক্ষেপের সুরে তিনি বলে ওঠেন, ‘বউ-পুনাই (ছেলে-মেয়ে) নিয়ে কষ্টেই আছি, ভাই। এই ইনকাম দিয়ে এহন আর চলে না।’ গত রোববার সকাল ৯টার দিকে জামালপুর শহরের সকালবাজার এলাকার ফুটপাতে দেখা মেলে আবদুল মালেকের। সেখানেই তিনি প্রতিদিন কলা বিক্রি করতে বসেন। ভোর থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সেখানে বসে কলা বিক্রি করেন। তাঁর ভাষ্য, পাইকারি কলার দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং বিক্রি কমে যাওয়ায় আগের মতো উপার্জনও প্রায় নেই বলা চলে। আবদুল মালেক প্রতিদিন পাইকারি বাজার থেকে মহাজনের কাছ থেকে বাকিতে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকার কলা নিয়ে আসেন। ওই কলা ঝুড়িতে করে কাঁধে তুলে সকালবাজার এলাকায় বসে বিক্রি করেন। এতে অনেক সময় তাঁর ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। পুরো কলা বিক্রি করে মহাজনকে কলার টাকা বুঝিয়ে দিয়ে বাড়িতে ফিরে যান। আবদুল মালেকের বাড়ি জামালপুর সদর উপজেলার তিতপল্লা ইউনিয়নের মাগুরিপাড়া এলাকায়। রোদ-বৃষ্টি-ঝড় যা–ই হোক না কেন, প্রতিদিন ভোরে প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে আবার কখনো ইজিবাইকে কলা বিক্রি করতে আসেন। প্রায় ১০ বছর ধরে এ পেশায় আছেন তিনি। এর আগে তিনি কৃষিকাজ করতেন। কথায়–কথায় জানালেন, তাঁর তিন ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হওয়ায় শ্বশুড়বাড়ি চলে গেছেন। অভাবের কারণে বড় ছেলের লেখাপড়া করানোর সুযোগ হয়নি। ছোট দুই ছেলেকে স্কুলে দিয়েছেন, কিন্তু সেই খরচ মেটাতে পারছেন না। পরে বাধ্য হয়ে সম্প্রতি বড় ছেলেকেও এই পেশায় নামিয়েছেন। আবদু মালেক জানান, অল্প পুঁজির ব্যবসা। আয় কমে যাওয়ায় এখন আর পুঁজিও নেই। মহাজনের কাছ থেকে বাকিতে কলা নিয়ে বিক্রি করেন। বিক্রি শেষে মহাজনকে টাকা দিয়ে বাড়িতে যেতে হয়। কলা বিক্রির আয়ের ওপর নির্ভর করে সব খরচ। তারপরও দিন শেষে যা হাতে আসে, তা দিয়ে পাঁচ সদস্যের পরিবারের খরচ মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। ফুটপাতে অপেক্ষারত অবস্থায় আলাপের এ পর্যায়ে আবদুল মালকের চোখেমুখে স্পষ্ট হয় ক্লান্তি ও অনিশ্চয়তার ছাপ। দিনের পর দিন জীবনসংগ্রামে ক্লান্ত মানুষটির কণ্ঠেও জমে আছে দীর্ঘশ্বাস। কেমন চলছে দিনকাল—এই প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নে আবদুল মালেক বলেন, ‘কোন বিয়ানবেলায় (ভোরে) আইছি। এক টেহাও বিক্রি করতে পারি নাই। দিনরাত বইসে থ্যাইকেও এহন আর আগের মতো বেচাবিক্রি নাই। যা ইনকাম হয়, মহাজনকে দিয়ে কিছুই আর লাভ থাহে (থাকে) না। এহন আর সংসার চলে না গো, বাপু। যে বাও-বাজার, ৪০০ থেকে ৫০০ টেহায় এহন আর কিছুই হয় না।’ একটু থেমে আবদুল মালেক আবার বলেন, ‘বিয়ানবেলায় কড়কড়া ভাত (বাসি ভাত) খাইয়ে বার হই। ওই রাইতে বাড়িত যাইয়্যা আবার খাই। এর মধ্যে নিজের জন্যে এক টেহাও খরচ করবার সাহস পাই না। যে ইনকামের অবস্থা, এক বেলা হোটেলে খাইতে গেলে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা লাগে। তাই ওমনেই থাকি। খাওয়ানের অভাবে দেহেন না, শরীরের মধ্যে কিছুই নাই।’ ওই আয় দিয়ে সংসার কীভাবে চলে, এমন প্রশ্নে আবদুল মালেক কিছুক্ষণ নীরব থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এরপর ধরে আসা গলায় বলেন, ‘বাজারে ওই টেহা নিয়ে কিছুই কিনা যায় না। প্রতিদিন দুই কেজি চাল লাগে। চাল কিনতেই ১২০ টেহা যাই গা। বাকি টেহা দিয়ে তরকারি (সবজি) কিনতেই শেষ হই যায়। কোনোরহমে খেয়ে না-খেয়ে দিন চলে। বছরে একবারও গরুর মাংস জুটে না।’

Published: প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬, ০৫: ২৪

Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/8e3gfveodl

পেশা জামালপুর জীবন ও জীবিকা ময়মনসিংহ বিভাগ জামালপুর সদর

Comments

No comments yet

Be the first to share your thoughts!