শোষণের ক্ষত মুছে যেভাবে বিশ্বকাপের ‘ডার্ক হর্স’ হয়ে উঠল সেনেগাল

ফুটবল বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে মেগা টুর্নামেন্টটিতে এখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচবার খেলার সুযোগ পেয়েছে আফ্রিকান পরাশক্তি সেনেগাল। বিশ্বমঞ্চে দলটির সর্বোচ্চ ও সেরা অর্জন বলতে রয়েছে কেবল একবার কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার স্মৃতি। তবে অতীতের সেই সাদামাটা পরিসংখ্যান পেছনে ফেলে এবার সেনেগাল...
ফুটবল বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে মেগা টুর্নামেন্টটিতে এখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচবার খেলার সুযোগ পেয়েছে আফ্রিকান পরাশক্তি সেনেগাল। বিশ্বমঞ্চে দলটির সর্বোচ্চ ও সেরা অর্জন বলতে রয়েছে কেবল একবার কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার স্মৃতি। তবে অতীতের সেই সাদামাটা পরিসংখ্যান পেছনে ফেলে এবার সেনেগাল স্বপ্ন বুনছে বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটা নিজেদের ঘরে তোলার। আর বর্তমান দলটির সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করলে তাদের এই আকাশচুম্বী স্বপ্ন দেখার পেছনে যথেষ্ট যৌক্তিক কারণও খুঁজে পাওয়া যায়।
আসন্ন বিশ্বকাপের টিকিট কাটার লড়াইয়ে পুরো বাছাইপর্বে কোনো ম্যাচ না হেরেই মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে সেনেগাল। এমনকি নিজেদের খেলা সর্বশেষ ১০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচের মধ্যে তারা হেরেছে মাত্র একটিতে। এর আগে আফ্রিকার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই ‘আফকন’-এর মুকুটও মাথায় তুলেছিল তারা। তবে টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার অনেকদিন পর এক নাটকীয় সিদ্ধান্তে আফকন কর্তৃপক্ষ সেই ম্যাচের বিজয়ী হিসেবে মরক্কোকে ঘোষণা করে। ওই আসর চলাকালেই ফুটবল ইতিহাসে নিজেদের সর্বোচ্চ ১২ নম্বর র্যাঙ্কিংয়ে চলে এসেছিল সেনেগাল, যা বর্তমানে ১৫ নম্বরে অবস্থান করছে। সব মিলিয়ে মাঠের পারফরম্যান্সে ফুটবল ইতিহাসের সেরা সোনালী সময় পার করছে সেনেগাল।
ফুটবল বোদ্ধারা সেনেগালের বর্তমান দলটিকে তাদের ইতিহাসের ‘সোনালী প্রজন্ম’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। ইতোমধ্যে আসন্ন টুর্নামেন্টের অন্যতম ‘ডার্ক হর্স’ খেতাবও জুটেছে তাদের কপালে। দলটিতে রয়েছেন সাদিও মানে, কালিদু কুলিবালি, অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার ইদ্রিসা গানা গেয়ে এবং তারকা গোলরক্ষক এদুয়ার্দ মেন্দির মতো বিশ্বমানের ফুটবলাররা। যেহেতু এই তারকাদের অনেকের জন্যই এটি ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ, তাই বিশ্বমঞ্চে নিজেদের উজাড় করে দেওয়ার এটাই তাদের জন্য শেষ ও সেরা সুযোগ।
কোনো ধরনের রাখঢাক না রেখে সরাসরি বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্য নিয়েই যে তারা মাঠে নামবেন, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন সেনেগালের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান কোচ পাপে থিয়াও। সম্প্রতি আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, ‘আমরা বিশ্বকাপে শুধু অংশ নেওয়ার জন্য যাচ্ছি না। সেনেগাল এখন এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে যেখানে আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত বিশ্বজয়। আমাদের সেই প্রতিভাবান ফুটবলার এবং আত্মবিশ্বাস দুটোই আছে। আমাদের এই সোনালী প্রজন্মের খেলোয়াড়দের জন্য আফ্রিকার ফুটবলকে বিশ্বমঞ্চের সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যাওয়ার এটাই উপযুক্ত সময়।’
দেশটির এই সাম্প্রতিক সাফল্যের পেছনে মাঠের কৌশলের পাশাপাশি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের এক দুর্দান্ত কূটনৈতিক চালও বড় ভূমিকা রেখেছে। তারা ইউরোপে, বিশেষ করে ফ্রান্সে বেড়ে ওঠা সেনেগালি বংশোদ্ভূত তরুণ প্রতিভাদের খুঁজে বের করে জাতীয় দলে ভেড়াতে শুরু করেছে। ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-২০ দলে খেলা পিএসজির ১৮ বছর বয়সী উইঙ্গার ইব্রাহিম এমবায়ে এবং চেলসির ২০ বছর বয়সী ডিফেন্ডার মামাদু সারের মতো প্রতিভাবানদের ফ্রান্সের রাডার থেকে একপ্রকার ছিনিয়ে এনে সেনেগালের জাতীয় জার্সিতে খেলিয়েছে দেশের ফুটবল ফেডারেশন। তবে সেনেগালের আজকের এই পরাশক্তি হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে আফ্রিকান ফুটবলের এক নির্মম আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার গল্প।
মাত্র ২ কোটি জনসংখ্যার একটি ছোট দেশ হয়েও সেনেগাল থেকে যেভাবে একের পর এক বিশ্বমানের ফুটবলার উঠে আসছে, তা বিশ্ব ফুটবলের জন্য এক বড় বিস্ময়। মূলত ‘জেনারেশন ফুট’ এবং ‘ডায়াম্বার্স’-এর মতো বিশ্বমানের স্থানীয় অ্যাকাডেমিগুলো এই ফুটবলার তৈরির নেপথ্য কারিগর হিসেবে কাজ করছে। ফরাসি ক্লাব এফসি মেটজ-এর মতো বড় বড় ইউরোপীয় ক্লাবগুলো এই স্থানীয় অ্যাকাডেমিগুলোতে প্রাথমিক কিছু বিনিয়োগ করে এবং খুব সস্তা দরে সেরা প্রতিভাদের ইউরোপে উগড়ে নিয়ে যায়। তবে এই আপাত সুন্দর প্রক্রিয়ার পেছনে লুকিয়ে আছে ‘নিউ কলোনিয়ালিজম’ বা নব্য-উপনিবেশবাদের মতো এক নির্মম ফুটবলীয় শোষণের চিত্র।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, সেনেগালের অ্যাকাডেমি থেকে উঠে আসা ১৩ জন খেলোয়াড়কে দলবদল বাবদ স্থানীয় অ্যাকাডেমিগুলো পেয়েছিল মাত্র ১ লাখ ১৬ হাজার ডলার। অথচ ইউরোপের ধনাঢ্য ক্লাবগুলো পরবর্তীতে সেই একই খেলোয়াড়দের অন্যান্য বড় ক্লাবের কাছে চড়া দামে বিক্রি করে মোট ৮ কোটি ১২ লাখ ডলার মুনাফা লুটেছে। পরবর্তীতে এই খেলোয়াড়দের পুরো ফুটবল ক্যারিয়ারের মোট ট্রান্সফার ফি হিসাব করলে তা ৪১ কোটি ডলার ছাড়িয় গেছে।
ইউরোপীয় ক্লাবগুলোর এই চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শোষণ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সেনেগালের শীর্ষ ক্লাবগুলোর একটির কর্মকর্তা মুস্তফা কামারা। আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘ইউরোপের ক্লাবগুলো আমাদের দেশে আসে এক একজন নিষ্ঠুর শিকারির মতো। তারা আমাদের অ্যাকাডেমিগুলো থেকে পানির দরে আমাদের সেরা প্রতিভাদের তুলে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে সেই খেলোয়াড়দের কোটি কোটি ডলারে বিক্রি করে তারা নিজেরা ধনী হচ্ছে, আর আমাদের স্থানীয় ক্লাবগুলো টিকে থাকার জন্য প্রতিদিন অর্থকষ্টে লড়াই করছে। আমাদের স্টেডিয়ামগুলোর অবস্থা জরাজীর্ণ, স্থানীয় লিগে কোনো স্পন্সর নেই। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী আমাদের যে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সেই টাকা তুলতেই আমাদের বছরের পর বছর লেগে যায়। এটা ফুটবলীয় শোষণ ছাড়া আর কিছুই নয়।’
Published: প্রকাশ : ২৮ মে ২০২৬, ০৫:৪৮
Comments
No comments yet
Be the first to share your thoughts!