শিক্ষাদানে মহানবীর অনন্য কৌশল: হাতে-কলমে ও পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতি

নবীজির শিক্ষাদানের একটি প্রধান মাধ্যম ছিল সরাসরি নিজে বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া। তিনি যখন কোনো কাজের আদেশ দিতেন, তা প্রথমে নিজে করে দেখাতেন।
মহানবী সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তিনিই নিরক্ষরদের মধ্যে তাদের একজনকে পাঠিয়েছেন প্রতিনিধিরূপে, যে তাদের পাঠ করে শোনায় তাঁর আয়াত, তাদেরকে পবিত্র করে এবং শিক্ষা দেয় তাদেরকে গ্রন্থ ও প্রজ্ঞা; এর আগে তারা ছিল ঘোর বিভ্রান্তিতে।’ (সুরা জুমুআ, আয়াত: ২)
আমাদের রাসুল মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন উম্মি বা নিরক্ষর, অর্থাৎ জাগতিক কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তিনি অক্ষরজ্ঞান লাভ করেননি। তা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন সমগ্র মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ ও আদর্শ শিক্ষক।
তিনি উম্মতকে শিক্ষা দিয়েছেন তাঁর জবান, কর্ম, আচরণ ও সূক্ষ্ম ইঙ্গিতের মাধ্যমে। মানবজীবন, জগৎ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর শিক্ষা ও কালোত্তীর্ণ দিকনির্দেশনা বিদ্যমান।
নবীজিকে মহান আল্লাহ পৃথিবীতে শিক্ষকরূপেই প্রেরণ করেছেন এবং এ বিষয়ে তিনি নিজেও ঘোষণা দিয়েছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) বলেন, ‘একদিন আল্লাহর রাসুল ঘর থেকে বের হয়ে মসজিদে প্রবেশ করলেন। সেখানে তিনি দুটি হালকা বা বৃত্তাকারে বসা দল দেখতে পেলেন।
প্রথম দলটি কোরআন তেলাওয়াত করছিল এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করছিল। দ্বিতীয় দলটি জ্ঞান অর্জন করছিল এবং অন্যদের শিক্ষা দিচ্ছিল।
নবীজি বললেন, উভয় দলই কল্যাণের ওপর রয়েছে। এই দলি কোরআন তেলাওয়াত করছে এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছে; আল্লাহ চাইলে তাদের দিতেও পারেন, আবার না-ও দিতে পারেন। আর এই দলটি শিক্ষা দিচ্ছে এবং শিক্ষা গ্রহণ করছে। আর আমি তো শিক্ষক হিসেবেই প্রেরিত হয়েছি। এরপর তিনি সেই শিক্ষাদানকারী দলের সঙ্গেই বসে গেলেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২২৯)
শিক্ষাদানে তাঁর হাতে-কলমে ও পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতির কয়েকটি কৌশল হলো:
নবীজির শিক্ষাদানের একটি প্রধান মাধ্যম ছিল সরাসরি নিজে বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া। তিনি যখন কোনো কাজের আদেশ দিতেন, তা প্রথমে নিজে করে দেখাতেন; যেন অন্যরা তা দেখে সহজে অনুসরণ করতে পারে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের আশা রাখে আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।’ (সুরা আহজাব, আয়াত: ২১)
মিম্বার তৈরির প্রেক্ষাপটসংবলিত একটি হাদিসে সাহল ইবনে সাদ (রা.) বলেন, ‘আমি দেখেছি, মিম্বারের ওপর আল্লাহর রাসুল (সা.) নামাজ আদায় করেছেন। এর ওপর উঠে তাকবির দিয়েছেন এবং এখানে দাঁড়িয়ে রুকু করেছেন। অতঃপর পেছনের দিকে নেমে এসে মিম্বারের গোড়ায় সিজদা করেছেন।
নামাজ শেষে সমবেত লোকদের দিকে ফিরে বলেছেন, হে লোকসকল, আমি এটা এ জন্য করেছি যে তোমরা যেন আমার অনুসরণ করতে পারো এবং আমার নামাজ শিখে নিতে পার।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯১৭)
এতে স্পষ্ট হয় যে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার জন্য নবীজি হাতে-কলমে এবং দৃশ্যমান পদ্ধতিতে গুরুত্ব দিতেন।
তিনি শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রম ও ধারাবাহিকতা রক্ষা করতেন। শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব বুঝে তিনি অল্প অল্প করে শেখাতেন; প্রথমে মৌলিক ও পরে আনুষঙ্গিক বিষয়।
যখন মুআজ (রা.)-কে ইয়েমেনে দাওয়াতের উদ্দেশ্যে পাঠালেন, তখন বললেন, ‘তুমি এমন এক জাতির কাছে যাচ্ছ, যারা আহলে কিতাব। সুতরাং তুমি প্রথমে তাদের এই সাক্ষ্য দেওয়ার দিকে আহ্বান জানাবে যে আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসুল।
যদি তারা এ কথা মেনে নেয়, তবে তাদের জানিয়ে দেবে যে আল্লাহ তাদের ওপর জাকাত ফরজ করেছেন; যা তাদের ধনীদের থেকে গ্রহণ করা হবে এবং দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪৯৬)
তিনি শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে সব সময় সাহাবিদের সময়, মানসিক অবস্থা ও ক্লান্তি বিবেচনা করতেন। সর্বদা ভারসাম্য রক্ষা করতেন যেন তাঁদের মধ্য একঘেয়েমি না আসে।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) সাহাবিদের বিরক্তি ও অবসাদের আশঙ্কায় প্রতিদিন ওয়াজ না করে দিনক্ষণ দেখে দেখে বিরতি দিয়ে উপদেশ দিতেন এবং বলতেন, ‘মহানবী আমাদের বিরক্তি ও অবসাদের আশঙ্কায় দিনক্ষণ দেখে দেখে উপদেশ দিতেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৮৬৬)
প্রত্যেক মানুষের বুঝ-বুদ্ধি, আবেগ ও সামাজিক বাস্তবতায় ভিন্নতা রয়েছে। নবীজি (সা.) সাহাবিদের শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে এই ভিন্নতাগুলোর বিশেষ বিবেচনা করতেন।
আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) বলেন, ‘আমরা আল্লাহর রাসুলের কাছে বসা ছিলাম। এমন সময় এক যুবক এসে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল, আমি কি রোজা রাখা অবস্থায় স্ত্রীকে চুম্বন করতে পারি? তিনি উত্তর দিলেন, না। এরপর একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি এলেন এবং একই প্রশ্ন করলেন।
তিনি উত্তর দিলেন, হ্যাঁ। আমাদের ভিন্ন ভিন্ন উত্তরের কারণ বুঝিয়ে তিনি বললেন, বৃদ্ধ ব্যক্তি নিজের আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে সক্ষম।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৬৬১৬)
মাঝেমধ্যে তিনি প্রথমে একটি যৌক্তিক প্রশ্ন উপস্থাপন করতেন, যেন সাহাবিদের পুরো মনোযোগ নির্দিষ্ট বিষয়ে নিবদ্ধ হয়। একবার সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের কারও দরজার সামনে যদি একটি নদী থাকে এবং সে তাতে প্রতিদিন পাঁচবার করে গোসল করে, তবে কি তার শরীরে কোনো ময়লা অবশিষ্ট থাকবে?’ সাহাবিরা উত্তর দিলেন, ‘না।’
মহানবী (সা.) বললেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের উদাহরণ ঠিক তেমনই। এর মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৬৭)
মন কোনো বিভ্রান্তির কুয়াশায় আচ্ছন্ন থাকলে মানুষের সহজাত ও আদিম বোধকে জাগিয়ে তুলতে নবীজি শুধু প্রশ্ন করতেন। এক যুবক তাঁর কাছে এসে ব্যভিচার করার অনুমতি চাইলে সাহাবিরা তাকে ধমক দেন।
কিন্তু নবীজি (সা.) তাকে কাছে বসিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি তোমার মায়ের জন্য এটি পছন্দ করো?’ সে বলল, ‘কখনো না।’ নবীজি বললেন, ‘অন্য মানুষেরাও তাদের মায়েদের জন্য এটি পছন্দ করে না।’
এভাবে তিনি তার মেয়ে, বোন, ফুফু ও খালার কথা উল্লেখ করে প্রশ্ন করলেন এবং যুবকটির ভেতরের সহজাত পবিত্রতাবোধ জাগ্রত করে তার বুকে হাত রেখে দোয়া করলেন। এর পর থেকে সেই যুবক আর কখনো কোনো মন্দ কাজের দিকে আগ্রহী হয়নি। (মুসনাদে আহমাদ, ৫/২৫৬, দারুল হাদিস, কায়রো, ১৯৯৫)
[email protected]
আবদুল্লাহিল বাকি : আলেম, লেখক ও সফটওয়্যার প্রোগ্রামার
Published: প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ১৩: ০০
Source: https://www.prothomalo.com/religion/islam/hd239opf6h
Comments
No comments yet
Be the first to share your thoughts!