রূপপুরের চুল্লিতে ইউরেনিয়াম, আগস্টে আসতে পারে বিদ্যুৎ
নিজস্ব প্রতিবেদক
April 29, 2026

দেশের সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প। বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে ইউরেনিয়াম বা পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ শুরু।
‘রূপপুর থেকে রূপান্তর’, এই স্লোগানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে পারমাণবিক জ্বালানি শক্তি ব্যবহারের যাত্রা শুরু হলো। পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে ইউরেনিয়াম বা পারমাণবিক জ্বালানি লোড (চুল্লিপাত্রে প্রবেশ করানো) শুরু হয়েছে। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চুল্লিপাত্রে জ্বালানি প্রবেশ করানো শেষে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া শেষ করতে সাড়ে তিন মাস সময় লাগতে পারে। এর মধ্য দিয়ে শুরু হবে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন। এতে করে আগামী আগস্টের শেষ দিকে জাতীয় গ্রিডে আসতে পারে ৩০০ মেগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ। তবে সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বাণিজ্যিকভাব�� বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে পারে আগামী বছরের মার্চ বা এপ্রিলে। গতকাল জ্বালানি প্রবেশ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, পারমাণবিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তাই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে সব কার্যক্রম সম্পন্ন করা হচ্ছে। নিরাপত্তা প্রটোকল মেনেই জ্বালানি প্রবেশ কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যা বাংলাদেশ ও রাশিয়ার জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরমাণু শক্তি কমিশন। এ প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট। প্রকল্পে প্রায় ৩০ হাজার দেশি-বিদেশি কর্মী দিন-রাত কাজ করছেন। এর মধ্যে প্রায় ৫ হাজার বিদেশি কর্মী। প্রকল্পটির সঙ্গে জড়িত বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, কলাকুশলীসহ চার শতাধিক অতিথি উপস্থিত ছিলেন গতকালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারে বাংলাদেশের এমন নবযাত্রায় শুভেচ্ছা ও সমর্থন জানান অতিথিরা। অনুষ্ঠানে প্রযুক্তিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাসহ অতিথিরা গোলাকার বলের মতো বোতাম চেপে ফুয়েল লোডিং শুরু করেন। সঙ্গে সঙ্গে পর্দায় দেখা যায় চুল্লিতে প্রবেশ করছে পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বলি)। এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় বিশ্বের ৩৩তম দেশ হলো বাংলাদেশ। প্রকল্পে জড়িত কর্মীদের উচ্ছ্বাস ও আনন্দ ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকে দলগত ছবি তুলছিলেন অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণে। অনুষ্ঠানের শেষ দিকে দেশি-বিদেশি বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের মধ্যে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে সনদ তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, রূপপুর প্রকল্প শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও দেশীয় সক্ষমতার একটি বাস্তব প্রতিফলন। রাশিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা এই প্রকল্পকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার কারিগরি সহায়তা ও আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ প্রকল্পটিকে নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য করেছে। অনলাইনে অনুষ্ঠানে যুক্ত হন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি। বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা শুরু থেকেই বাংলাদেশের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এবং নিরাপদ ও সুরক্ষিত প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিয়ে দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ বলেন, সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও সর্বোচ্চ মান বজায় রাখা হয়েছে। নিরাপদ পারমাণবিক কেন্দ্র থেকেই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। আগামী বছর দ্বিতীয় ইউনিটে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, পরিকল্পনা, নির্মাণ ও পরীক্ষণের মতো জটিল ধাপ অতিক্রম করে আজকের এই পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সুযোগ এনে দিয়েছে রূপপুর। রূপপুরে চুল্লিপাত্রের পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ শুরু হওয়ার খবর জানেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। অনুষ্ঠান শুরুর আগে রূপপুর মোড়ে বিবিসি বাজার এলাকার নাজমুল হোসেন বলেন, অনেক বছর ধরে শুনছেন প্রকল্পটি চালু হবে। কিন্তু হচ্ছিল না। এখন জ্বালানি লোডিংয়ের খবরে আশ্বস্ত হয়েছেন। আশা করছেন খুব শিগগির বিদ্যুৎ পাবেন। প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল রূপপুর প্রকল্পের মেয়াদ। মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করেছে সরকার। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে মেয়াদ বাড়লেও প্রকল্পের খরচ বাড়ানোর সুযোগ নেই। কিন্তু ডলারের দাম বাড়ায় ২৬ হাজার কোটি টাকা খরচ বেড়েছে প্রকল্পের। সে হিসাবে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা খরচ হবে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে।Published: প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৯: ৩১
বিদ্যুৎ খাত
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র
Comments
No comments yet
Be the first to share your thoughts!