পিরিয়ড নিয়ে যেসব ভুল ধারণা আছে
ঋতুস্রাব বা মাসিক নারীর জীবনের একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। তবু আমাদের সমাজে এটি নিয়ে রয়েছে অসংখ্য ভুল ধারণা, লজ্জা ও গোপনীয়তা। ‘মাসিক’ শব্দটি উচ্চারণ করতেও অনেকে সংকোচ বোধ করেন। ফলে কিশোরী ও নারীরা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যজ্ঞান থেকে বঞ্চিত হন এবং নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হন।
আধুনিক যুগে এসেও মাসিক নিয়ে প্রচলিত কুসংস্কার ও অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস আমাদের সমাজে গভীরভাবে রয়ে গেছে। তাই মাসিক নিয়ে সচেতনতা ও সঠিক স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে আলোচনা জরুরি।
মাসিক সম্পর্কে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো, ঋতুস্রাবের সময় মেয়েরা ‘অপবিত্র’ থাকে। এ ধারণার কারণে অনেক পরিবারে এ সময় নারীদের রান্নাঘরে যেতে দেওয়া হয় না, ধর্মীয় কাজে অংশ নিতে বাধা দেওয়া হয়, এমনকি আলাদা ঘরে থাকতে বাধ্য করা হয়।
বাস্তবে মাসিক কোনো রোগ নয়, এটি নারীর প্রজননক্ষমতার স্বাভাবিক প্রকাশ। কোনো মেয়ে বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছানোর পর প্রতি মাসে শরীরে হরমোনের প্রভাবে জরায়ুর ভেতরের স্তর তৈরি হয় এবং গর্ভধারণ না হলে সেটি রক্তের সঙ্গে বের হয়ে আসে। এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া।
আরেকটি প্রচলিত মিথ হলো, মাসিক চলাকালে গোসল করা উচিত নয়। অনেকে মনে করেন যে গোসল করলে রক্তক্ষরণ বেড়ে যায়, শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। অথচ এ সময় নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা অত্যন্ত জরুরি। হালকা গরম পানি দিয়ে গোসল করলে শরীর সতেজ থাকে, ব্যথা কমে এবং সংক্রমণের ঝুঁকিও কমে। একইভাবে টক খাবার, দুধ, মাছ বা ডিম খাওয়া যাবে না, এ ধরনের ধারণারও কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং মাসিকের সময় পুষ্টিকর খাবার খাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক কিশোরী প্রথমবার মাসিক শুরু হওয়ার সময় ভয় পেয়ে যায়, কারণ আগে থেকে কেউ তাদের বিষয়টি বুঝিয়ে বলেন না। স্কুল কিংবা পরিবারে যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা না থাকায় তারা বিভ্রান্ত হয়। অনেকেই মনে করে, এটি কোনো অসুখ বা শরীরের কোনো ক্ষতি। অথচ সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য দিলে তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এ পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে পারে।
স্যানিটারি প্যাড ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেকে রাসায়নিক সুগন্ধযুক্ত প্যাড পছন্দ করেন। এতে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই নিরাপদ হলো কোনো ধরনের সুগন্ধি ছাড়া প্যাড ব্যবহার করা। এতে যৌনাঙ্গের পিএইচ ভারসাম্য ঠিক থাকে, জ্বালাপোড়া, চুলকানির ঝুঁকি কমে আসে।
মাসিক স্বাস্থ্যবিধি নারীর সুস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় পরিষ্কার ও নিরাপদ স্যানিটারি প্যাড, কাপড় বা মেনস্ট্রুয়াল কাপ ব্যবহার করা উচিত। যাঁরা কাপড় ব্যবহার করেন, তাঁদের অবশ্যই কাপড়টি ভালোভাবে সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে রোদে শুকাতে হবে। অনেক নারী লজ্জার কারণে কাপড় লুকিয়ে অন্ধকার বা স্যাঁতসেঁতে জায়গায় শুকান, ফলে জীবাণু থেকে যায় এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
স্যানিটারি প্যাড দীর্ঘ সময় ব্যবহার করাও ক্ষতিকর। সাধারণ ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা পরপর প্যাড পরিবর্তন করা উচিত। অতিরিক্ত সময় একই প্যাড ব্যবহার করলে দুর্গন্ধ, চুলকানি, ফুসকুড়ি ও সংক্রমণ হতে পারে। ব্যবহৃত প্যাড নির্দিষ্টভাবে মুড়িয়ে ডাস্টবিনে ফেলা উচিত, যাতে পরিবেশদূষণ না হয়।
মাসিকের সময় ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি মানসিক যত্নও জরুরি। এ সময় হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে অনেকের মেজাজ বদলে যায়, খিটখিটে ভাব বা ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করা প্রয়োজন। ‘এত রাগ করছ কেন, তোমার কি মাসিক চলছে?’—এ ধরনের বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য নারীর মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
গ্রামাঞ্চলে এখনো অনেক স্কুলে পর্যাপ্ত টয়লেট ও স্যানিটারি ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। ফলে অনেক কিশোরী মাসিকের সময় স্কুলে যেতে চায় না, এমনকি পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এটি শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ও শিক্ষাগত সমস্যা। স্কুলে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট, পরিষ্কার পানি ও স্যানিটারি ন্যাপকিনের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। মাসিক নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও চিকিৎসকদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
মা-বাবাদের উিত কন্যাসন্তানের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করা এবং বয়ঃসন্ধিকাল নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা করা। একই সঙ্গে ছেলেদেরও এ বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন, যাতে তারা বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শেখে এবং নারীদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ করে।
বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশে ‘পিরিয়ড পভার্টি’ বা মাসিক সামগ্রীর দারিদ্র্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। অর্থনৈতিক কারণে অনেক নারী নিরাপদ স্যানিটারি পণ্য ব্যবহার করতে পারেন না। বাংলাদেশেও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সুলভমূল্যে বা বিনা মূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন সরবরাহের উদ্যোগ বাড়ানো উচিত।
স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করলেই শুধু মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন সম্পূর্ণ হয় না। মাসিকের সময় আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি—
প্রতিদিন অন্তত ১–২ বার পরিষ্কার পানি দিয়ে যৌনাঙ্গের বাইরের অংশ ধুতে হবে। অতিরিক্ত সাবান, সুগন্ধি ওয়াশ বা কেমিক্যাল ব্যবহার না করাই ভালো। কারণ, এগুলো স্বাভাবিক জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
৪ থেকে ৬ ঘণ্টার বেশি একই প্যাড ব্যবহার না করা ভালো। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে আরও দ্রুত পরিবর্তন করতে হবে।
পরিষ্কার ও শুকনো অন্তর্বাস ব্যবহার করুন। সুতি অন্তর্বাস ব্যবহার করতে চেষ্টা করুন, এটিই সবচেয়ে ভালো। ভেজা বা টাইট আন্ডারওয়্যার সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।
মাসিকের সময় অনেকে পুরোনো কাপড় ব্যবহার করেন। সে ক্ষেত্রে সাবান ও গরম পানি দিয়ে কাপড় ধুয়ে সরাসরি রোদে শুকাতে হবে। স্যাঁতসেঁতে বা অন্ধকার জায়গায় শুকালে জীবাণু থেকে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
এই সময়ে হাত ধোয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্যাড পরিবর্তনের আগে ও পরে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। এটি সংক্রমণ প্রতিরোধে খুব কার্যকর।
ব্যবহৃত প্যাড বা ন্যাপকিন টয়লেটে ফ্লাশ করবেন না, কাগজ অথবা প্যাকেটে মুড়িয়ে ডাস্টবিনে ফেলুন।
মাসিকের সময় শরীর দুর্বল লাগতে পারে। তাই পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া দরকার। এ সময় পানি, ফল, শাকসবজি, ডিম, মাছ ও আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া জরুরি।
শরীরের ক্লান্তি ও ব্যথা কমাতে বিশ্রাম দরকার। হালকা ব্যায়াম বা হাঁটাহাঁটি অনেক সময় আরাম দেয়।
অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, তীব্র ব্যথা, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব, চুলকানি বা জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
এই কয়েকটা দিন মেজাজের পরিবর্তন বা অস্থিরতা স্বাভাবিক। পরিবারের সহানুভূতি ও নিজের প্রতি যত্ন এ সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ।
একজন চিকিৎসক হিসেবে বারবার বলছি, মাসিক লজ্জার নয়, এটি নারীর শক্তি ও জীবনের ধারাবাহিকতার প্রতীক। কুসংস্কার নয়, প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতা। নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষিত হলেই পরিবার ও সমাজ সুস্থ থাকবে। তাই মাসিককে গোপনীয়তার অন্ধকার থেকে বের করে সচেতনতার আলোয় নিয়ে আসা জরুরি।
Published: আপডেট: ২০ মে ২০২৬, ১২: ৫৫
Source: https://www.prothomalo.com/lifestyle/health/57zsxxqj2v
Comments
No comments yet
Be the first to share your thoughts!