ফলভর্তি হাজার কমলাগাছ কাটা হলো উচ্ছেদ অভিযানে

আট বছরের পরিশ্রমে গড়ে তোলা হয়েছিল এক হাজারের বেশি গাছের বিশাল কমলার বাগান। এবার গাছগুলোতে ফল ধরেছিল। দুই মাস অপেক্ষা করলেই কমলাগুলো তখন পাকতে শুরু করত। কয়েক লাখ টাকার কমলা বিক্রি করে ঋণের টাকা শোধের স্বপ্ন দেখছিল একটি পরিবার, তা আর হলো না। বাগানটি বনের জায়গায় পড়ায় তা উচ্ছেদ অভিযানে কেটে ফেলা হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে ১৬ জুলাই মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি সংরক্ষিত বনের আদমপুর বিটের কালিঞ্জি এলাকায়। এদিন উপজেলা প্রশাসন, বন বিভাগ ও পুলিশের যৌথ অভিযানে রাজকান্দি সংরক্ষিত বনের প্রায় পাঁচ একর জমি দখলমুক্ত করা হয়।
অভিযানের কয়েক দিন পর ফলভর্তি গাছ কেটে ফেলার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, বাগানজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে কাটা কমলা ও মাল্টার গাছ। অধিকাংশ গাছেই থোকায় থোকায় ফল ঝুলছে। কেউ বনভূমি রক্ষার পক্ষে মত দিচ্ছেন, আবার কেউ ফল সংগ্রহের সুযোগ না দিয়েই গাছ কেটে ফেলাকে অমানবিক বলছেন। আর দুই মাসের মতো সময় পেলে ফল সংগ্রহ করা সম্ভব হতো।
স্থানীয় বাসিন্দা রহিম শেখ বলেন, বনের জায়গায় বাগান করা যদি বেআইনি হয়, তাহলে আট বছর ধরে কীভাবে গাছ লাগিয়ে বড় করা হলো? ফল আসার পর এভাবে গাছ কেটে ফেলা মানবিক হয়নি। এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা উচিত।
বাগানটি গড়ে তোলা পরিবার বন বিভাগের বিরুদ্ধে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ তুলেছে। তাঁদের দাবি, চাঁদা না দেওয়ায় ফল ধরার সময়ই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাগানটি কেটে ফেলা হয়েছে। তবে বন বিভাগ অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, সংরক্ষিত বনভূমিতে ব্যক্তিগতভাবে কোনো বাণিজ্যিক বাগান করা সম্পূর্ণ বেআইনি। ওই জমিতে অবৈধভাবে ব্যক্তিগত ফলের বাগান, মৎস্য খামার ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছিল, যা বন আইনের পরিপন্থী। বনভূমি দখলমুক্ত করার অংশ হিসেবে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়, কমলার বাগান উচ্ছেদ করা তারই অংশ।
বাগানটির মালিক দাবি করা আলিম উল্লা জানান, তাঁর দাদা বন ভিলেজার হিেবে ওই এলাকায় বসবাস শুরু করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় তাঁদের পরিবারও দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করছে। ২০১৮ সালে তাঁরা কমলার বাগানটি গড়ে তোলেন। শুরুতে বন বিভাগের কোনো বাধা ছিল না, বরং সহযোগিতাও পেয়েছিলেন। আলিম উল্লার অভিযোগ, এবার গাছে ফল আসার পর বন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা না দেওয়ায় পুরো বাগান কেটে ফেলা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে রাজকান্দি রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক প্রীতম বড়ুয়া জানান, সংরক্ষিত বনভূমিতে শুধু বনজ গাছই থাকবে। জবরদখল করে পান, কমলা, মাল্টা, আনারসসহ যেকোনো বাণিজ্যিক চাষ সম্পূর্ণ বেআইনি। বনের জমি দখল করে সেখানে ফলের বাগান, ফিশারি ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছিল। বনভূমি উদ্ধার করতে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। প্রতি মাসেই এ ধরনের অভিযান হয়। চাঁদাবাজির যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
ওই বাগানে এত দিন কেন উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়নি, এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথম আলোকে প্রীতম বড়ুয়া বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। এখানে এসে বন বিভাগের জায়গা দখল হয়েছে দেখে অভিযানে নেমেছি।’
হঠাৎ বাগানটি কেটে ফেলায় ঋণের চাপে পড়েছে আলিম উল্লার পরিবার। তাঁর স্ত্রী সালমা বেগম বলেন, ৮ বছরে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা খরচ করে বাগানটি গড়ে তুলা হয়েছিল। বেশির ভাগ টাকা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করা। কমলার গাছগুলো যদি কাটতেই হতো, অন্তত ফলগুলো ঘরে তোলার সুযোগ দিলে কিছু ঋণ শোধ করতে পারতাম। এখন গাছও নেই, আয়ও নেই, শুধু ঋণের বোঝা রয়ে গেছে। তাঁর প্রশ্ন, বাগানটি যদি অবৈধই হয়ে থাকে, তাহলে আট বছর আগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? ফল ধরার সময়ই–বা কেন উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলো?
বন বিভাগের উচ্ছেদের নিয়ম কেমন, দখলদারদের সম্পদ সরাতে সময় দেওয়া হয় কি না, এমন প্রশ্নে সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বনের ভেতরে কেউ অবৈধভাবে দখল করে যদি ঘরবাড়ি বা অন্যান্য স্থাপনা করেন, তাহলে আমরা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে নোটিশ পাঠাই। সময় দিই। সময়ের মধ্যে না সরালে আমরা উচ্ছেদ করি। আর যদি কেউ বনের জমি দখল করে বাগান তৈরির চেষ্টা করেন, তাহলে তাৎক্ষণিক আমরা উচ্ছেদ অভিযান চালাতে পারি।’
Published: প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ১৩: ৫৩
Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/0ojex78fi6
Comments
No comments yet
Be the first to share your thoughts!