ফিদেল কাস্ত্রো যে তাঁর বাবা জেনেছেন অনেক পরে, নির্বাসিত আলিনা কী বলছেন কিউবার সরকার নিয়ে

কাস্ত্রোর এই মেয়েটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে নির্বাসিত অবস্থায় বসবাস করছেন
কিউবার প্রয়াত নেতা ফিদেল কাস্ত্রোকে নিয়ে আলিনা ফার্নান্দেজের প্রথম স্মৃতি হলো টেলিভিশনের পর্দায় তাঁর দীর্ঘ বক্তৃতা দেখা ও শোনা। শুধু তিনিই নন, তাঁর মতো ৭০ বছর বয়সী অনেক কিউবার নাগরিকের কাছে কাস্ত্রোকে নিয়ে প্রথম স্মৃতি এমনটাই।
গত সোমবার সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আলিনা ফার্নান্দেজ বলেন, ‘আমাদের প্রজন্ম টিভির সামনে বসে প্রার্থনা করত, যেন তিনি দ্রুত বক্তৃতা শেষ করেন। তাহলে আমরা কার্টুন দেখতে পারতাম। এভাবেই আমি বড় হয়েছি।’
পরে একদিন ফার্নান্দেজ জানতে পারেন, সেই ফিদেল কাস্ত্রোই তাঁর বাবা। কাস্ত্রো নিয়মিত সন্ধ্যাবেলায় তাঁদের বাড়িতে এসে তাঁর মায়ের সঙ্গে দেখা করতেন। তাঁর মা ছিলেন কাস্ত্রোর সাবেক প্রেমিকা।
কাস্ত্রোর এই মেয়েটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। এখন তাঁর অবস্থান কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে। তবে এরপরও ফার্নান্দেজ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো কিউবার সরকারকে কম গুরুত্ব দিচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন যখন কিউবায় সরকার পরিবর্তনের জন্য চাপ দিচ্ছে, তখন তিনি তা নিয়ে সতর্ক করেছেন।
আলিনা বলেছেন, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে সরকার উৎখাতের চেষ্টা করা হলে তা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।
আলিনা সিএনএনকে বলেন, ‘অবিলম্বে হামলা হবে বলে কিউবার নাগরিকদের সতর্ক করার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। আমরা ৬৭ বছর ধরেই হামলার মধ্যে আছি বা হামলার আশঙ্কার মধ্যে আছি। আমি নিশ্চিত, তারা প্রস্তুত। তারা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, আমি জানি না।’
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল–দিয়াজ ক্যানেল সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি কিউবার ওপর সামরিক হামলা চালায়, তাহলে সেখানে ‘রক্তপাত’ হবে। আলিনা ফার্নান্দেজও এ কথার সঙ্গে একমত।
আলিনা বলেন, ‘আমরা জানি, এ ধরনের সরকারগুলো সাধারণ মানুষকে যুদ্ধের মুখে ঠেলে দেয়। যখন সামরিক বা রাজনৈতিক সহিংসতার পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন তা খুবই উদ্বেগজনক। আমার মনে হয়, পরিবর্তন এলে আমি হয়তো খুশি হব। কিন্তু যেভাবে সেই পরিবর্তন আসবে, তা খুবই যন্ত্রণাদায়ক হবে।’
কাস্ত্রোর ছায়ায় বেড়ে ওঠা
আলিনা বলেন, তিনি যখন আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে পারেন, ফিদেল কাস্ত্রো তাঁর বাবা, যখন তাঁর বয়স ছিল ১০ বছর। তখন তাঁর মা তাঁকে বলেন, হাভানায় তাঁদের বাড়িতে নিয়মিত যিনি আসতেন, তিনিই তাঁর বাবা।
আলিনা বলেন, কথাটি শুনে তিনি তখন খুব একটা অবাক হননি। কারণ, কাস্ত্রো নিয়মিতই তাঁদের বাড়িতে আসতেন। শিশু আলিনাকে যে বিষয়টি অবাক করেছিল, সেটা হলো আশপাশের প্রায় সবাই আগে থেকেই বিষয়টা জানত।
আলিনা বলেন, ‘আমি আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুকে বিষয়টি বলেছিলাম। তখন সে আমাকে জানায়, সে আগেই এটা জানত। এরপর আমার মনে হয়েছিল, আমার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। আমার কাছে সত্য গোপন রাখা হয়েছিল।’
কাস্ত্রোর মেয়ে বলেন, তাঁর উদাসীন স্বভাবের বাবার মধ্যে তাঁর মা কী দেখেছিলেন, তা তিনি বুঝতে পারেন না। তাঁর বিশ্বাস, তাঁর মা কাস্ত্রোকে যতটা ভালোবাসতেন, কাস্ত্রো তাঁর মাকে ততটা ভালোবাসতেন না।
১৯৫০-এর দশকে কিউবায় বিপ্লবের সময় তাঁদের পরিচয় হয় এবং পরে তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আলিনা জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৬ সালে। এর তিন বছর আগে বাবা কাস্ত্রো সিয়েরা মায়েস্ত্রা পর্বত থেকে নেমে এসে ফুলজেনসিও বাতিস্তার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন।
মায়ের সম্পর্কে আলিনা বলেন, ‘তিনি যত দিন বেঁচে ছিলেন, তত দিনই তাঁকে (কাস্ত্রো) ভালোবেসে গেছেন। বিষয়টি আমার জন্য বোঝাটা খুব কঠিন।’
ফিদেল কাস্ত্রোর মৃত্যুর এক বছর আগে ২০১৫ সালে আলিনার মা মারা যান।
মায়ামির অ্যাপার্টমেন্টের ছোট্ট রান্নাঘরে বসে সিএনএনের প্রতিবেদককে আলিনা বলেন, তিনি নিজেকে বিশেষ কেউ মনে করেন না। এমনকি তিনি নিজেকে সত্যিকার অর্থে ফিদেল কাস্ত্রোর মেয়ে বলেও মনে করেন না। বিষয়টি হয়তো বিদ্রূপাত্মক। তবে কাস্ত্রোবিরোধী কিউবার নাগরিকদের মধ্যেই তিনি জীবনের ‘একমাত্র স্বস্তির জায়গা’ খুঁজে পেয়েছেন। রঙিন ওয়ালপেপার ও চোখে পড়ার মতো লোকশিল্প দিয়ে সাজানো ছোট একটি ডুপ্লেক্স বাড়িতে তিনি থাকেন।
আলিনা বলেন, ‘আমি নিজেকে কিউবার অন্য নাগরিকদের মতোই মনে করি। নিজেকে একজন নির্বাসিত নারী, একজন ভুক্তভোগী হিসেবে মনে করি।’
কাস্ত্রোর মেয়ে তাঁর বাবার রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে একমত নন। ১৯৮০–এর দশকের শেষ দিকে তিনি কিউবা সরকারের প্রতি পুরোপুরি হতাশ হয়ে পড়েন এবং প্রকাশ্যে সরকারের সমালোচনা শুরু করেন। পরে ১৯৯৩ সালে তিনি মাকে নিয়ে কিউবা ছাড়েন।
আলিনা বলেন, ‘আমার মা ছিলেন খুবই বিপ্লবপন্থী, আর আমি ছিলাম পুরোপুরি বিপ্লববিরোধী।’
রাউল কাস্ত্রোকে ঘিরে বিতর্ক
কিউবা ছাড়ার পর থেকে আলিনা দেশটির পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন। তিনি মনে করেন, সাম্প্রতিক সময়ে কিউবা সরকারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর বক্তব্যের পেছনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের না যত ভূমিকা আছে, তার েয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভূমিকা বেশি। এই রুবিও কিউবার বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক।
আলিনা আরও মনে করেন, তাঁর চাচা রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে যা শোনা যাচ্ছে, তা আসলে কিউবা সরকারের বিরুদ্ধে আরও পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য মার্কিন সরকারের একটি অজুহাত। তবে এ বিষয়ে কী হতে পারে, তা নিয়ে তিনি স্পষ্ট করে কিছু বলতে চান না।
চাচা রাউল কাস্ত্রো সম্পর্কে আলিনার মত হলো, তিনি তাঁর ভাইয়ের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন পারিবারিক মানুষ।
ট্রাম্প মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে কিউবা সহজেই ভেঙে পড়বে। তবে আলিনা সতর্ক করে বলেছেন, কিউবা সরকারকে হালকাভাবে নেওয়া ঠিক হবে না এবং তারা হুমকির জবাব দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
Published: প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬, ১২: ২৯
Comments
No comments yet
Be the first to share your thoughts!