Home Articles বাংলাদেশ

‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে’, পরে মা ও নবজাতকের মৃত্যু, ঘটনাটি বাংলাদেশের নয়

নিজস্ব প্রতিবেদক September 02, 2026
‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে’, পরে মা ও নবজাতকের মৃত্যু, ঘটনাটি বাংলাদেশের নয়

ভারতের মধ্যপ্রদেশে মা ও নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় প্রকাশিত ফটোকার্ড, শিরোনাম ও থাম্বনেইলে ঘটনাস্থলের পরিচয় ছাড়াই ছড়িয়ে পড়েছে।

‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে’, সন্তান জন্মদানের আগে নারীর আর্তনাদ, পরে মা ও নবজাতকের মৃত্যু—এমন ক্যাপশন ও শিরোনামে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই মিনিটের বেশি সময়ের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।

ভিডিওতে দেখা যায়, হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে এক প্রসূতি নারী কান্নাকাটি করছেন এবং স্বজনদের কাছে তাঁকে সেখান থেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আকুতি জানাচ্ছেন। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর একই বক্তব্যের সঙ্গে বিভিন্ন ফটোকার্ডও প্রকাশ করা হয়েছে। কোথাও লেখা হয়েছে, ‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে বলার পরেই মা ও নবজাতকের মৃত্যু’, আবার কোথাও ‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে—শেষ আকুতির পর মা ও নবজাতকের মৃত্যু’।

ফেসবুকে ভিডিও ও এসব ফটোকার্ড ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লেও অনেক পোস্ট, ফটোকার্ড ও থাম্বনেইলে ঘটনাটি কোথায় ঘটেছে, তা উল্লেখ করা হয়নি। ফলে প্রথম দেখায় এটি বাংলাদেশের কোনো হাসপাতালের ঘটনা বলে মনে হওয়ার বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

তবে যাচাই করে জানা যায়, ভিডিওটি বাস্তব হলেও ঘটনাটি বাংলাদেশের নয়। এটি ভারতের মধ্যপ্রদেশের রেওয়া জেলার সঞ্জয় গান্ধী মেমোরিয়াল হাসপাতালে ঘটে। সেখানে ২৫ বছর বয়সী কল্পনা মিশ্র সন্তান জন্ম দেওয়ার আগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্বজনদের কাছে তাঁকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার আকুতি জানিয়েছিলেন। পরে কল্পনা ও তাঁর নবজাতকের মৃত্যু হয়।

তবে চিকিৎসায় অবহেলার কারণেই তাঁদের মৃত্যু হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কিছু জানা যায়নি। ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত চলছে।

বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো বিভিন্ন পোস্ট ও ফটোকার্ডে ভারত বা মধ্যপ্রদেশের কোনো পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি।

ফলে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী নিউজফিডে শুধু প্রসূতি নারীর কান্নার ভিডিও, ‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে’ বক্তব্য এবং পরে মা ও নবজাতকের মৃত্যুর তথ্য দেখলে সহজেই ধরে নিতে পারেন, ঘটনাটি বাংলাদেশের কোনো হাসপাতালের।

অন্যদিকে কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক পেজ ভিডিও ও ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও বিস্তারিত প্রতিবেদনের ভেতরে ভারতের পরিচয় উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ, বিভ্রান্তির বড় সুযোগ তৈরি হচ্ছে শিরোনাম, ফটোকার্ড ও থাম্বনেইলে ঘটনাস্থলের পরিচয় বাদ পড়ার কারণে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক ব্যবহারকারী পুরো প্রতিবেদন না পড়ে নিউজফিডে দেখা ফটোকার্ড, ভিডিও কিংবা কয়েক লাইনের ক্যাপশন থেকেই একটি ঘটনা সম্পর্কে ধারণা তৈরি করেন। তাই বাস্তব কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে দেশ বা স্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ গেলে সেটি সহজেই ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ছড়িয়ে পড়ত পারে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভিডিওটি কিংবা মা ও নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনাটি অসত্য নয়। বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে বাস্তব একটি ঘটনার স্থানের পরিচয় বাদ দিয়ে প্রচারের কারণে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কল্পনা মিশ্র গত ২৫ আগস্ট রাতে মধ্যপ্রদেশের রেওয়া জেলার সঞ্জয় গান্ধী মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি প্রথম সন্তানের জন্ম দিতে সেখানে গিয়েছিলেন। পরদিন, ২৬ আগস্ট রাতে তাঁর সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার হয় এবং তিনি একটি সন্তান জন্ম দেন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কল্পনা ও তাঁর নবজাতকের মৃত্যু হয়।

মৃত্যুর আগে ধারণ করা কল্পনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তাঁকে হাসপাতালের ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে এসে কান্নাকাটি করতে এবং স্বজনদের কাছে তাঁকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য আকুতি জানাতে দেখা যায়। হাসপাতালের কর্মীরা তাঁকে সামলানোর চেষ্টা করেন এবং পরে আবার ভেতরে নিয়ে যান। ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

লিংক: এখানে

কল্পনার পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালে চিকিৎসায় অবহেলার কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তাঁর বাবা রামশরণ মিশ্র অভিযোগ করেন, কল্পনা বারবার চিকিৎসার জন্য আকুতি জানালেও যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। পরিবারের দাবি, অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পর কল্পনা আর জ্ঞান ফিরে পাননি। স্বজনদের সন্দেহ, অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার কারণেও তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।

তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন এবং চিকিৎসায় অবহেলার কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে—এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।

হাসপাতালের ডিন সুনীল আগরওয়াল ঘটনাটিকে অত্যন্ত মর্মান্তিক হিসেবে উল্লেখ করে জানান, পরিবারের উত্থাপিত অভিযোগ তদন্ত কমিটি খতিয়ে দেখবে। কল্পনা অচেতন হওয়ার পর কেন আর জ্ঞান ফিরে পাননি, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

অন্যদিকে হাসপাতাল সুপারিনটেনডেন্ট রাহুল মিশ্র চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ নাকচ করেছেন। তাঁর দাবি, কল্পনাকে নির্ধারিত প্রটোকল অনুসরণ করেই চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল এবং চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে কোনো অবহেলা হয়নি।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, কল্পনা গর্ভাবস্থায় প্রয়োজনীয়সংখ্যক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাননি। তাঁদের দাবি, নির্ধারিত সময়ে অন্তত আটটি পরীক্ষা করার কথা থাকলেও তাঁর নথিতে মাত্র দুটি পরীক্ষার তথ্য পাওয়া গেছে। দুটিই একটি বেসরকারি হাসপাতালে করা হয়েছিল।

দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসপাতালের চিকিৎসা নথিতে কল্পনার শারীরিক অবস্থার কিছু গুরুতর সমস্যার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁর রক্তে প্লাটিলেটের াত্রা ছিল প্রতি মাইক্রোলিটারে প্রায় ৩০ হাজার, যা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। তাঁর রক্তচাপও ছিল অত্যন্ত বেশি এবং লিভারের এনজাইমের মাত্রা বেড়ে গিয়েছিল।

তবে এসব শারীরিক জটিলতাকে তাঁর মৃত্যুর চূড়ান্ত কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্তের বিষয়।

ঘটনার প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে দুই চিকিৎসক ও দুই নার্সিং কর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক সোনাল আগরওয়াল ও অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের নিধি পান্ডের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে অবহেলা ও দায়িত্বে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ পাওয়া যায়। পরিবারের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগের পর দুই নার্সিং কর্মীকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

ঘটনার তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। তদন্তে কারও দায় প্রমাণিত হলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

Published: প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১: ২৮

Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/yu45oh8wnc

ফ্যাক্ট চেক ভারত মৃত্যু চিকিৎসক নারী প্রথম আলো ফ্যাক্ট চেক

Comments

No comments yet

Be the first to share your thoughts!