ঐতিহ্য ধরে রাখতে গ্রামবাসীর চাঁদায় ১২৫ ফুটের বাইচের নৌকা

পাবনার আটঘরিয়ার চাঁন্দাইয়ে কৃষক-শ্রমিকসহ সবার চাঁদায় তৈরি হচ্ছে ১২৫ ফুটের বাইচের নৌকা ‘চাঁন্দাই জনতা এক্সপ্রেস’। ঐতিহ্য আর একতার প্রতীক হয়ে উঠেছে নৌকাটি।
কেউ দিয়েছেন ১০ টাকা, কেউ হাজার টাকা। কেউ আবার দিয়েছেন লাখ টাকা। কৃষক, শ্রমিক, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে প্রবাসী—সবাই চাঁদা দিচ্ছেন। সেই টাকায় তৈরি হচ্ছে ১২৫ ফুট দীর্ঘ একটি বাইচের নৌকা। প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে তৈরি হতে যাওয়া নৌকাটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘চাঁন্দাই জনতা এক্সপ্রেস’।
পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার একদন্ত ইউনিয়নের চাঁন্দাই গ্রামের এই নৌকা ঘিরে এখন যেন উৎসব চলছে। গ্রামের ছোট্ট বাজারের পাশের মাঠে ত্রিপল টাঙিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিশাল প্যান্ডেল। সেখানেই চলছে নৌকা তৈরির কাজ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রবীণ-নবীন মানুষের আনাগোনা। কারিগরেরা কাঠে কাঠে পেরেক ঠুকে নৌকার অবয়ব দিচ্ছেন। আর তাঁদের উৎসাহ দিতে কখনো কখনো বেজে উঠছে জারি-সারি গান।
গত বুধবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা গেল এমনই দৃশ্য। চারদিকে বিল-জলাশয়, মাঝখানে সবুজে ঘেরা চাঁন্দাই গ্রাম। প্যান্ডেলের নিচে বিশাল কাঠের নৌকাটি যেন ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। নৌকার নামের মধ্যেও আছে একতার বার্তা। আয়োজকেরা বলছেন, গ্রামের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগেই নৌকাটি তৈরি হচ্ছে। তাই নামের সঙ্গে ‘জনতা’ শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে।
প্রায় চার দশকের নৌকাবাইচের ঐতিহ্য
চাঁন্দাইয়ের মানুষের নৌকাবাইচের সঙ্গে সম্পর্ক বহু পুরোনো। গ্রামের প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৮৮ সালে প্রথম একটি বাইচের নৌকা তৈরি করেছিলেন তাঁরা। কৃষক-শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নিয়ে গড়ে ওঠে বাইচালদের (যাঁরা নৌকায় বইঠা টানেন) দল। পরে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শুরু করেন তাঁরা।
সময়ের সঙ্গে সাফল্যও আসে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কারের পাশাপাশি ১০টি দ্বিতীয় পুরস্কার পেয়েছে চাঁন্দাইয়ের বাইচাল দল। বুড়িগঙ্গা নদীতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতাতেও দুইবার প্রথম হওয়ার গৌরব রয়েছে তাদের। ফলে নৌকাবাইচ শুধু খেলা নয়, চাঁন্দাইয়ের মানুষের কাছে এটি এখন ঐতিহ্য ও আবেগের অংশ।
গ্রামের ৮০ বছর বয়সী গোলজার হোসেনও একসময় ছিলেন বাইচাল। যুবক বয়সে নৌকায় বসে বইঠা টেনেছেন। বয়সের ভারে এখন আর বাইচে অংশ নিতে পারেন না। তবে সেই টান এখনো কাটেনি। প্রতিদিনই নৌকা তৈরির জায়গায় এসে কিছুক্ষণ বসেন তিনি।
নৌকাবাইচের ঐতিহ্য বংশ পরম্পরায় চলে আসছে বলে জানান একই গ্রামের নায়েব আলী (৬২)। তিনি বলেন, ‘একসময় বাপ-চাচারা বাইচ দিত, তারপর আমরা, এখন ছাওয়ালরা বাইচ খেলে। খুব ভালো লাগে।’
৫০ বছরের অভিজ্ঞ হাতে নৌকা
‘চাঁন্দাই জনতা এক্সপ্রেস’ তৈরি করছেন কারিগর দুলাল চন্দ্র সূত্রধর (৭০)। বাবার কাছেই বাইচের নৌকা তৈরির কাজ শিখেছিলেন তিনি। এরপর প্রায় ৫০ বছর ধরে নিজেই তৈরি করছেন নৌকা। দেশের বিভিন্ন জেলায় গিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ৭০টি বাইচের নৌকা তৈরি করেছেন তিনি।
সাধারণ নৌকার তুলনায় বাইচের নৌকা তৈরি করা বেশি কঠিন বলে জানান দুলাল চন্দ্র সূত্রধর। তিনি বলেন, এ ধরনের নৌকা তৈরিতে শাল, গর্জন ও সেগুন কাঠ ব্যবহার করা হয়। আগুনে কাঠ পুড়িয়ে প্রয়োজনমতো বাঁকানো হয়। এরপর লোহার পাত ও পেরেক দিয়ে জোড়া লাগানো হয় কাঠের বিভিন্ন অংশ। নৌকা বানানোর সময় প্রতিটি জায়গার মাপ ঠিক রাখতে হয়। একটি বাইচের নৌকা তৈরি করতে দেড় থেকে দুই মাস সময় লাগে। নৌকার আকার অনুযায়ী কারিগরেরা দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত মজুরি নেন।
সবার টাকায় সবার নৌকা
‘চাঁন্দাই জনতা এক্সপ্রেস’ তৈরির জন্য গ্রামের মানুষ নিজেরাই অর্থ সংগ্রহ করেছেন। কেউ দিয়েছেন সামান্য, কেউ দিয়েছেন বড় অঙ্কের অর্থ। প্রবাসীরাও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
নৌকা পরিচালনা কমিটির সদস্য ও একদন্ত ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আসাদুল ইসলাম বলেন, নৌকাবাইচ গ্রামবাংলার ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্য ধরে রাখতেই গ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ঐক্যবদ্ধ। এই গ্রাম থেকে তিনটি নৌকা তৈরি হয়েছে। এখন চতুর্থ নৌকাটি তৈরি হচ্ছে। নৌকাটি তৈরিতে প্রায় ১৫ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। গ্রামের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। নৌকা তৈরিকে কেন্দ্র করে পুরো গ্রামেই উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
প্রস্তুত হচ্ছে নতুন প্রজন্মও
নৌকাটির জন্য নবীন ও অভিজ্ঞদের নিয়ে বাইচালদের একটি দলও প্রস্তুত করা হয়েছে। নৌকা তৈরির কাজ শেষ হলেই আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে। এরপর হবে পরীক্ষামূলক বাইচ। পরে দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রতিযোগিতায় ‘চাঁন্দাই জনতা এক্সপ্রেস’ নিয়ে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুনদের সঙ্গে অভিজ্ঞ বাইচালরাও থাকবেন উল্লেখ করে নৌকাটির মাঝি আবু সাঈদ বলেন, ‘নৌকা তৈরি হলেই অনুশীলন শুরু হবে। আমাদের লক্ষ্য, দেশের বিভিন্ন জায়গার বাইচে অংশ নেওয়া।’
আয়োজকেরা আশা করছেন, ১৭–১৮ দিনের মধ্যে নৌকাটির নির্মাণকাজ শেষ হবে।
ঐতিহ্য বাঁচাতে সহায়তার প্রত্যাশা
গ্রামের মানুষের নিজেদের উদ্যোগেই বছরের পর বছর ধরে টিকে আছে নৌকাবাইচের এই আয়োজন। তবে এতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নেই বলে আক্ষেপ রয়েছে আয়োজকদের।
নিজেদের সামর্থ্য দিয়ে এই ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন জানিয়ে নৌকা পরিচালনা কমিটির সদস্য আবদুল মান্নান বলেন, ‘নৌকার সঙ্গে গ্রামের মানুষের ঐক্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে। আমাদের গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কৃষিজীবী ও দরিদ্র। সরকার সহযোগিতা করলে আরও ভালোভাবে এই ঐতিহ্য ধরে রাখা সম্ভব হতো।’
Published: আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১২: ০৮
Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/5i6pji0skg
Comments
No comments yet
Be the first to share your thoughts!