
গলায় একটা দলা পাকানো কষ্ট আটকে আছে। হাজার চেষ্টায়ও তা নামছে না। আমাকে এই কষ্টে ফেলেছে সাড়ে ছয় বছরের আফরিন হোসেন।
অদ্ভুত মায়াময় এই মেয়েটির এখন স্কুলে যাওয়ার কথা। মা-বাবার সাথে ছুটির দিনে পার্ক, চিড়িয়াখানা বা মেলায় ঘুরতে যাওয়ার কথা। কিন্তু সে এখন হাসপাতালের বিছানায়। সে জানে না, তার বিছানা লাগোয়া জানালার পাশে ‘উটের গ্রীবার মতো’ মৃত্যুর আশঙ্কা এসে উঁকি দিচ্ছে। কথাটা জানেন চিকিৎসকেরা। আর জানেন, আফরিনের মা রাশামনি আর বাবা আবুল হোসেন।
রাশামনি আর আবুল হোসেন যদি জানতেন, তাঁদের মেয়েটির বাঁচার কোনো পথ খোলা নেই, তাহলে হয়তো আশা ছেড়ে দিয়ে মেয়েকে কোলে নিয়ে তার চিরবিদায়ের জন্য অপেক্ষা করতে পারতেন।
কিন্তু ‘সমস্যা’ হলো, আশা এখনো আছে। সেই আশা বেশ জোরালো। আফরিনের ঠিক চিকিৎসা হলে সে আবার ‘আব্বা!’ , ‘আম্মু!’ বলে ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে কোলে এসে পড়বে। এই আশা তাঁদের ঘুমাতে দিচ্ছে না।
আফরিনের বয়স যখন আড়াই বছর তখন তার মস্তিস্কে টিউমার ধরা পড়ে। তখন থেকেই তাকে নিয়ে তার বাবা মায়ের সংগ্রাম শুরু। টিউমার থেকে তা ক্যান্সারে মোড় নেয়। এ পর্যন্ত তার মাথায় পাঁচবার অপারেশন করা হয়েছে। ৩০টি রেডিও থেরাপি দেওয়া হয়েছে। এই প্রচন্ড যন্ত্রনাদায়ক চিকিৎসা এতদিন বাংলাদেশেই হচ্ছিল। মাঝে মাঝে সে বেশ সুস্থ অবস্থায় ছিল।
তবে এখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। হালকা তরল খাবার ছাড়া আফরিন কিছু খেতে পারছে না। চিকিৎসকেরা তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতের ভেলোরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। আফরিনকে নিয়ে তার বাবা মা এখন সেখানকার সিএমসি হাসপাতালে।
আবুল হোসেন গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের গোপনীয় সহকারী (সিএ) পদে চাকরি করেন। তিনি জমি বিক্রি করে, ঋণ করে এত দিন মেয়ের চিকিৎসা চালিয়ে এসেছেন।
এখন তাঁর সম্পদ বলতে ঘরের কিছু আসবাবপত্র ছাড়া কিছু নেই। আর আছে গলা পর্যন্ত ঋণ। এই ঋণের বোঝা নিয়েই তিনি ভেলোরে গেছেন। সেখানে আফরিনের মাথায় ষষ্ঠ দফা অস্তোপচার করা হবে।
চিকিৎসকেরা বলেছেন, তার চিকিৎসায় প্রায় ১২ লাখ টাকা দরকার। কিন্তু আবুল হোসেন আর পারছেন না। তবু তিনি মেয়েকে বাঁচানোর চেষ্টায় মরিয়া হয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
আবুল হোসেন ও তাঁর স্ত্রী রাশামনি অলৌকিক কিছু ঘটার আশায় আছেন। পৃথিবীতে যা কিছু অলৌকিক ঘটনা ঘটে, খোঁজ নিলে দেখা যায়, তার পেছনে পরম করুণাময় কোনো না কোনো কার্যকারণ রেখে যান।
আবুল হোসেনের কথা শুনে ও আফরিনের ছবি দেখে আমিও এক অলৌকিক ঘটনার জন্য অপেক্ষা করছি। সেই ‘অলৌকিক’ ঘটনার জন্য দরকার কিছু ‘অলৌকিক মানুষ’।
যে দেশে হাজার হাজার কোটিপতির বাস, যে দেশে সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় কোটি টাকা কয়েক দিনের মধ্যে গণচাঁদা তুলে জোগাড় করে ফেলা যায়, যে দেশে অসংখ্য-অগণিত মানুষ প্রতিদিন বিনোদনের পেছনে লাখ লাখ টাকা খরচ করে, সেই দেশে আফরিন ‘আব্বা, আমার ব্যথা লাগতেছে’ বলতে বলতে মরে যাবে, এটা কেমন কথা!
মধ্যবিত্তের ‘আত্মসম্মানবোধ’ প্রবল হয়। তারা না খেয়ে থাকে কিন্তু চাইতে পারে না। কিন্তু কন্যার শারীরিক যন্ত্রণা পিতার সহ্য করা কঠিন। তাই অসহায় হয়ে আবুল হোসেন মেয়ের উন্নত চিকিৎসার জন্য সেই ‘অলৌকিক’ মানুষের কাছে সহায়তা চেয়েছে।
আফরিন এই পৃথিবীর সন্তান। তাঁর চিকিৎসার খরচ জোগানোর দায় ছিল তার মা-বাবার। তাঁরা সব হারিয়ে এখন যেহেতু সর্বস্বান্ত, সেহেতু সেই দায় আমাদের। এই দায় অস্বীকারের কোনো পথ নেই।
কোনো হৃদয়হীন কোটিপতি এই দায় এড়াতে চাইলে এড়াতে পারেন, কিন্তু ধনী-গরিব যেকোনো হৃদয়বান মানুষ এর দায় এড়াতে পারেন না।
অনেক সময় একটি মসজিদ বা একটি মন্দির বা একটি হাসপাতাল বহু মানুষের চাঁদার টাকা�� নির্মিত হয়। সেখানে চাঁদা দেওয়া কোনো ব্যক্তি যখন সেই মসজিদ বা মন্দির বা হাসপাতালের কাছে আসেন, তখন তিনি এক স্নিগ্ধ প্রশান্তি অনুভব করেন।
তাঁর মনে হতে থাকে, তিনি যে ভবনের সামনে দাঁড়ানো, সেই ভবনের কোনো না কোনো ইট কিংবা কোনো না কোনো বালুকণায় তাঁর উপার্জিত অর্থ মিশে আছে। তিনি অনুভব করেন, এই ভবনে তাঁর ভাগ আছে।
হৃদয়বান মানুষের সামনে আফরিন এখন সেই মহান ইমারতের মতো। সবার ছোট ছোট দানে যদি আফরিনের চিকিৎসার বিপুল অঙ্কের অর্থ জোগাড় করা সম্ভব হয়, যদি সেই অর্থের চিকিৎসায় সে সেরে ওঠে, সে যদি সুস্থ হয়ে আবার ফিক করে একদিন হেসে ওঠে, সেই হাসির স্নিগ্ধ আলোর জ্যোতির মধ্যে দানকারী প্রত্যেক মানুষের ভাগ থাকবে।
এ ধরনের মহৎ কাজে সফলতা পাওয়ার জন্য ধনী মানুষের চেয়ে হৃদয়বান দাতার প্রয়োজন বেশি। করুণার ধরন হলো আকাশ ভেঙে নামা বৃষ্টির মতো, তার স্পর্শে দাতা-গ্রহীতা দুজনই ধন্য হয়।
আফরিন সেই ধন্য হওয়া মানুষের অপেক্ষায় আছে। কিছু অলৌকিক মানুষের অপেক্ষায় আছে। সেই সহায়তার পরিমাণ ১০ টাকা হলেও তা আফরিনের জন্য অনেক।
আফরিনের চিকিৎসায় সাহায্য পাঠানোর জন্য যোগাযোগ করতে পারেন।
আবুল হোসেন (হোয়াটসঅ্যাপ)-01677257294
সহায়তা পাঠানোর বিকাশ নম্বর: (মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট)—01896199125
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট: G. M ABUL HOSSEN AC NO.6109334085112. ROUTING NO.200350792. SONALI BANK PLC PACHURIA BRANCH, GOPALGANJ.
সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক
ইমেইল: [email protected]
Published: প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৭: ৩০
Source: https://www.prothomalo.com/opinion/column/ud7j6j0tno
Comments
No comments yet
Be the first to share your thoughts!