Home Articles ইসলাম

মসজিদে দাঁড়িয়ে খলিফা ওমরের ভুল শুধরে দিয়েছেন এক নারী

ধর্ম ডেস্ক July 10, 2026
মসজিদে দাঁড়িয়ে খলিফা ওমরের ভুল শুধরে দিয়েছেন এক নারী

সপ্তম শতাব্দীর মদিনায় এক বেনামী কোরাইশি নারী রাষ্ট্রীয় নীতির বিরুদ্ধে যেভাবে কণ্ঠ তুলেছিলেন, আর স্বয়ং খলিফাতুল মুসলিমিন যেভাবে তাঁর যুক্তি মেনে নিজের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেছিলেন, তা আজকের নারী অধিকার নিয়ে আলোচনার যুগেও এক অনন্য নজির।

এই কাহিনি ইবনে কাসির, কুরতুবি, ইবনে আশুরের মতো প্রসিদ্ধ তাফসিরে উদ্ধৃত হয়েছে।

দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাবের খেলাফতকালে (৬৩৪-৬৪৪ খ্রি.) আরবের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে দেনমোহরের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়, যা সাধারণ পুরুষদের বিয়ের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল।

সমস্যা সমাধানে খলিফা ওমর (রা.) মিম্বরে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, কোনো নারী চারশ দিরহামের (রৌপ্যমুদ্রা) বেশি দেনমোহর দাবি করতে পারবে না।

ঘোষণা শেষ হতে না হতেই এক নারী দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুললেন। নারীটি বলেন, ‘হে আমিরুল মুমিনীন, আল্লাহর কিতাব বেশি অনুসরণযোগ্য, নাকি আপনার ঘোষণা?’ ওমর (রা.) জবাব দিলেন, ‘অবশ্যই আল্লাহর কিতাব। কিন্তু কেন এ কথা বলছেন?’

নারী তখন সুরা নিসার ২০ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করলেন, ‘তোমরা যদি এক স্ত্রীর স্থলে অন্য স্ত্রী পরিবর্তন করতেই চাও এবং তাদের একজনকে অগাধ সম্পদও (কিনতার) দিয়ে থাকো, তবুও তা থেকে কিছুই ফেরত নিও না’। (তাহির ইবনে আশুর, আত-তাহরির ওয়াত-তানউইর, ৫/৪২)

তাঁর যুক্তি ছিল একই সঙ্গে সহজ। অর্থাৎ, আল্লাহ যেখানে স্তূপীকৃত স্বর্ণ দেনমোহর হিসেবে দেওয়াকে বৈধতা দিয়েছেন, সেখানে রাষ্ট্র কীভাবে তার সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দিতে পারে?

ওমর (রা.) মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন, তারপর বিনয়ের সঙ্গে ভুল স্বীকার করলেন, ‘একজন সাধারণ নারীর ফিকহ ওমরের চেয়ে বেশি।’

দেনমোহর মানুষের দেওয়া অনুগ্রহ নয়, ঐশ্বরিক বিধান। এই পার্থক্যটাই নারীর যুক্তির ভিত্তি ছিল।

অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘নারীটি সত্য বলেছে, খলিফা ভুল করেছে।’ এরপর তিনি পুনরায় মিম্বরে উঠে নিজের আদেশ বাতিল করেন। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ২/২১৩)

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো ফকিহ বা মুফাসসির, ইবনে আতিয়্যাহ, ফখরুদ্দিন আর-রাজি, ইমাম কুরতুবি, হাফেজ ইবনে কাসির কেউই এই প্রতিবাদকে ‘বেয়াদবি’ বলে উড়িয়ে দেননি।

বরং সবাই এটাকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে একটা আইনি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে দেনমোহরের কোনো সর্বোচ্চ সীমা রাষ্ট্র বা সমাজ নির্ধারণ করতে পারে না। (কুরতুবি, আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, ৫/৯৯)

ইমাম রাজি আরেক ধাপ এগিয়ে বলেন, দেনমোহর স্বামীর পক্ষ থেকে কোনো দয়া নয়, আল্লাহ বিবাহে নারী-পুরুষ উভয়কে সমান আনন্দ দিলেও, নির্দেশ দিয়েছেন পুরুষকে দেনমোহর দিতে। ফলে এটা মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকেই নারীর জন্য নির্ধারিত একটা বিশেষ অধিকার। (মাফাতিহুল গায়েব, ৯/১৭৮)

অথচ দেনমোহরের বিধানটাই আমাদের সমাজে প্রহসনে পরিণত হয়েছে। কাবিননামায় লাখ টাকা লেখা হলেও বাস্তবে পরিশোধ হয় না, একে ‘তালাকের জরিমানা’ ভাবা হয়।

অথচ ইসলামে এটা বিয়ের শুরুতেই নারীকে সম্মানের সঙ্গে বুঝিয়ে দেওয়ার বাধ্যতামূলক দেনা। মায়েরা-বোনেরা পৈত্রিক সম্পত্তি দাবি করলে নানা অজুহাতে বঞ্চিত করা হয় যে অধিকার সেই নাম-না-জানা নারী চৌদ্দশ বছর আগে খলিফার সামনে দাঁড়িয়ে আদায় করেছিলেন।

তবে এই ঘটনার শিক্ষা নারীর সাহসে যতটা, তার চেয়েও বড় ছিল খলিফার প্রতিক্রিয়ায়।

অর্ধ-পৃথিবীর শাসক, একজন প্রতাপশালী নেতা, একজন সাধারণ নারীর যুক্তির সামনে নিজের অহংকার মুহূর্তেই সরিয়ে রেখেছিলেন। ভুল স্বীকার করতে এক সেকেন্ডও দ্বিধা করেননি, তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত পাল্টেছেন।

আজকের ধর্মীয় বা রাজনৈতিক নেতৃত্বে এই বুদ্ধিবৃত্তিক নম্রতা আর সমালোচনা সহ্য করার সক্ষমতা প্রায়ই অনুপস্থিত। সমাজ থেকে অন্যায়-বৈষম্য দূর করতে হলে খলিফা ওমরের এই ইনসাফ আর সেই নাম-না-জানা নারীর ধর্মতাত্ত্বিক সচেতনতা—দুটিই ফিরিয়ে আনা দরকার।

Published: প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ০৮: ০০

Source: https://www.prothomalo.com/religion/islam/m2n7gk0vi3

ইসলামের কথা ইতিহাস কোরআনের বাণী নারী সাহাবি হজরত উমর (রা.) নারী

Comments

No comments yet

Be the first to share your thoughts!