মার্কিন বন্ড বাজারে অস্থিরতা, বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত

গতকাল মঙ্গলবার ৩০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদহার উঠে যায় ৫ দশমিক ২ শতাংশে, যা ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথাতেই বিষয়ি বোঝা যায়। সেটা হলো, শেয়ারবাজার বা পণ্যের বাজারে মাঝেমধ্যে এমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, যা সহজেই উপেক্ষা করা যায়। কিন্তু বন্ড বাজার যখন অস্থির হয়ে ওঠে, তখন গুরুত্ব দিতেই হয়।
২০২৫ সালের এপ্রিলে বন্ড বাজারে বড় ধরনের বিক্রির চাপই শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকে পারস্পরিক শুল্কনীতির গতি কমাতে বাধ্য করেছিল। এখন আবারও বন্ড ব্যবসায়ীরা সতর্কসংকেত দিচ্ছেন। তবে এবার পরিস্থিতি শান্ত করার মতো খুব বেশি কিছু ট্রাম্পের হাতে আছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টউড ক্যাপিটালের ব্যবস্থাপনা অংশীদার ড্যানিয়েল অ্যালপার্ট সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘তেলের দাম নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, বন্ড বাজারে তার প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। আর (ট্রাম্প) নিজেই যে সমস্যার মধ্যে আমাদের ফেলেছেন, সেখান থেকে কীভাবে বের হতে হবে, তা যেন তিনি বুঝতে পারছেন না।’
সহজ করে বললে, বন্ড ব্যবসায়ীরা এখন মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে যে মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়েছে, তা ট্রাম্প যেভাবে ‘স্বল্পমেয়াদি’ বলে দাবি করছেন, বাস্তবে বিষয়টি হয়তো তেমন নয়। এ ধারণা শক্তিশালী হলে বন্ডের দাম আরও কমতে পারে।
এটি শুধু বিনিয়োগকারীদের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও উদ্বেগের বিষয়। সিএনএনের সাংবাদিক ডেভিড গোল্ডম্যান বন্ড বাজারকে পুরোনো দাঁড়িপাল্লার সঙ্গে তুলনা করেছেন। পাল্লার এক পাশে থাকে বন্ডের দাম, অন্য পাশে থাকে সুদের হার।
এখন নানাবিধ অর্থনৈতিক শঙ্কার কারণে সেকেন্ডারি বাজারে বন্ডের দাম কমছ। এর মধ্যে আছে—
ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় দ্রুত বর্ধনশীল জাতীয় ঋণ।
ভোক্তা ঋণের চাপ।
ইরান যুদ্ধের ব্যয়।
সুদের হার আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে অর্থায়নের ব্যয়।
বন্ডের দাম যত কমে, সুদের হার তত বাড়ে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীরা সরকারকে মূলত বলছেন, ‘আমাদের অর্থ ধরে রাখতে চাইলে আরও বেশি সুদ দিতে হবে।’
এর অর্থ হলো, জাতীয় ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় বাড়বে। যে কারণে শেষমেশ করদাতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে সামাজিক সেবা খাতে ব্যয়ের সুযোগও কমে যাবে। আবার যুক্তরাষ্ট্রে গৃহঋণ, গাড়ির ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার ১০ বছরের ট্রেজারি বন্ডের সুদের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের ঋণের ব্যয়ও বাড়বে। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাবে। এমনকি মন্দার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে, যদিও সেই পরিস্থিতি এখনো খুব কাছাকাছি নয়।
গতকাল মঙ্গলবার বন্ড বাজারের উদ্বেগ এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও তা দূর হয়নি। ৩০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদহার উঠে যায় ৫ দশমিক ২ শতাংশে, যা ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ। একই দিনে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক টানা তৃতীয় দিনের মতো কমেছে।
শেয়ার ও পণ্যের বাজারে সাধারণত ট্রাম্প বা অন্য বিশ্বনেতাদের বক্তব্যে দ্রুত প্রতিক্রিয়া হয়, কিন্তু বন্ড বাজার ভিন্ন ধরনের।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গত প্রায় তিন মাসে ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, যুদ্ধ ‘শেষ হওয়ার খুব কাছাকাছি’। তাঁর এমন মন্তব্যে প্রায় প্রতিবারই শেয়ারবাজারে সূচক বেড়েছে এবং তেলের দাম কমেছে।
গত সোমবার ট্রাম্প বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা’র স্বার্থে তিনি ইরানের ওপর হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করছেন। এতে শেয়ারবাজার ক্ষতি অনেকটা কাটিয়ে ওঠে এবং তেলের মূল্যবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়। কিন্তু বন্ড বাজারে তার প্রভাব পড়েনি; বরং বিশ্বজুড়ে বন্ড বিক্রি চলতেই থাকে।
বিষয়টি হলো, বিনিয়োগকারীরা শুধু যুদ্ধ বা তেলজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন নন। তাঁদের দৃষ্টিতে এখন একসঙ্গে একাধিক সংকট।
বার্কলেজের গবেষণা বিভাগের বৈশ্বিক চেয়ারম্যান অজয় রাজাধ্যক্ষ সোমবার এক নোটে লেখেন, ‘গল্পটি খুবই সহজ, কিন্তু অস্বস্তিকর—উন্নত বিশ্বে ঋণ অনেক বেশি, আর্থিক শৃঙ্খলা ভঙ্গুর। এ দুটি সমস্যার সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছাও নেই...জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি যেন বোঝার ওপর শাকের আঁটি’।
Published: প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬, ১২: ৫১
Source: https://www.prothomalo.com/business/world-business/51w2euipa1
Comments
No comments yet
Be the first to share your thoughts!