Home Articles ইসলাম

‘লাইক-শেয়ারের’ ভিড়ে কোবানির নিয়ত নষ্ট হচ্ছে না তো

মনযূরুল হক May 28, 2026
‘লাইক-শেয়ারের’ ভিড়ে কোবানির নিয়ত নষ্ট হচ্ছে না তো

পবিত্র ঈদুল আজহা আমাদের ত্যাগ, আত্মশুদ্ধি এবং মহান আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের শিক্ষা দেয়। তবে বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জোয়ারে আমাদের এই পবিত্র ইবাদতের মূল সুরটি এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।

কোরবানির পশু কেনা থেকে শুরু করে জবাই—সবকিছুর ছবি ও ভিডিও এখন ফেসবুক, টিকটক বা ইনস্টাগ্রামে প্রকাশ করার এক তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। পশুর দাম, জাত, কিংবা ওজনের বড়াই করে ভিউ বা ‘লাইক-শেয়ার’ পাওয়ার এই মানসিকতা আমাদের নিয়তকে কতটুকু কলুষিত করছে, তা ভাবার সময় এসেছে।

ইসলামে লোকদেখানো মনোভাব বা ‘রিয়া’ ইবাদত ধ্বংসের অন্যতম কারণ।

ইসলামে যেকোনো আমল কবুল হওয়ার প্রধানতম শর্ত হলো নিয়তের বিশুদ্ধতা, যা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হতে হবে। কোরবানি কোনো সামাজিক উৎসব বা আভিজাত্য প্রদর্শনের মাধ্যম নয়।

রাসুল (সা.) এই বিষয়ে উম্মতকে কঠোরভাবে সতর্ক করে গেছেন। তিনি বলেছেন, “নিশ্চয়ই সমস্ত আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১)

সুতরাং, পশু কেনার সময় মনে যদি এই সুপ্ত বাসনা থাকে যে লোকে আমাকে ধনী বলবে, পশুর দাম শুনে বাহবা দেবে, তবে সেই কোরবানি আল্লাহর দরবারে পণ্ডশ্রমে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আজকের দিনে পশুর হাটে গিয়ে বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ‘কে কত চড়া দামে পশু কিনল’—তা নিয়ে দেদারসে স্ট্যাটাস দেওয়া হচ্ছে। অথচ মহান আল্লাহর কাছে পশুর মূল্য বা দৈহিক অবয়বের কোনো মূল্য নেই।

তিনি পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, “আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।” (সুরা হজ, আয়াত: ৩৭)

কোরবানিদাতার অন্তরে আল্লাহর ভয় এবং ত্যাগের আকাঙ্ক্ষা কতটুকু জাগ্রত হলো, শরিয়ত কেবল সেটিই পরিমাপ করে। যখনই এই ইবাদতে লৌকিকতা বা সামাজিক জাহির করার মানসিকতা প্রবেশ করে, তখনই তা তাকওয়ার পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়।

ইসলামি পরিভাষায় লোকদেখানো ইবাদতকে ‘রিয়া’ বলা হয়, যাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) ‘ছোট শিরক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। গোপনে বা প্রকাশ্যে মানুষের প্রশংসা কুড়ানোর উদ্দেশ্যে ইবাদত করা হলে তা আল্লাহর দরবারে প্রত্যাখ্যাত হয়।

হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ-তাআলা বলেন, “আমি শরিকদের (শিরককারী) শিরক থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যে ব্যক্তি কোনো আমল করল এবং তাতে আমার সাথে অন্য কাউকে শরিক করল, আমি তাকে ও তার শিরককে বর্জন করি।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৮৫)

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোরবানির পশুর ছবি দিয়ে প্রশংসা পাওয়ার অবচেতন আকাঙ্ক্ষাও এই রিয়া-র অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যা পুরো কোরবানিকে পুণ্যহীন করে দেয়।

ফিকহশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কিতাবগুলোতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি কেবল লোকদেখানো বা গোশত খাওয়ার নিয়তে কোরবানি দেয়, তবে তার কোরবানি শুদ্ধ হবে না।

যদি কোরবানিদাতার নিয়ত আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে লৌকিকতা বা প্রশংসা লাভ করা হয়, তবে তার কোরবানি বাতিল বলে গণ্য হবে এবং এতে সে কোনো সওয়াব পাবে না। (ইবনুল আবিদিন, ফাতাওয়ায়ে শামি, ৬/৩২০, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)

এমনকি ভাগে কোরবানির ক্ষেত্রে সাত শরিকের মধ্যে কোনো একজনের নিয়তেও যদি এই লোকদেখানো ভাব থাকে, তবে বাকি শরিকদের কোরবানিও নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। (ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি, ৫/৩০৪, মাকতাবায়ে রশিদিয়া, কোয়েটা, ১৯৮০)

প্রযুক্তির ব্যবহার ইসলামে নিষিদ্ধ নয়; পশুর কৃত্রিম সংকট এড়াতে বা জনসচেতনতা তৈরিতে ডিজিটাল হাট বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ছবি শেয়ার করা যেতে পারে। তবে তা যেন কোনোভাবেই আত্মঅহংকার বা লৌকিকতার পর্যায়ে না পৌঁছায়।

কোরবানি দেওয়ার সময় আমাদের হৃদয়কে সব ধরনের সামাজিক দেখনদারি থেকে মুক্ত রাখতে হবে।

আসুন, ভার্চুয়াল লাইকের চেয়ে মহান আল্লাহর দরবারে আমাদের কোরবানি কবুল করানোর চিন্তায় মগ্ন হই। তবেই পশুর গলায় ছুরি চালানোর পাশাপাশি নিজের ভেতরের অহংবোধকে কোরবানি দেওয়া সম্ভব হবে।

Published: প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৬, ০৩: ০০

Source: https://www.prothomalo.com/religion/islam/icyypnjisc

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইসলামের কথা কোরবানি ঈদুল আজহা নিয়ত

Comments

No comments yet

Be the first to share your thoughts!