হোম আর্টিকেল বিশ্ববাণিজ্য

ইরানে আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্সের দাম ৫০০ কোটি রিয়াল, সীমাহীন জনদুর্ভোগ

বাণিজ্য ডেস্ক May 04, 2026
ইরানে আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্সের দাম ৫০০ কোটি রিয়াল, সীমাহীন জনদুর্ভোগ

ইরানে দ্রব্যমূল্য দ্রুত বাড়ছে। সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে কারণে অর্থনীতিতে সৃষ্টি হচ্ছে গভীর ক্ষত। পরিণতি হলো, লাখ লাখ মানুষের চাকরি হারিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়া। চলতি সপ্তাহের প্রথম দিন থেকেই ইরানের মানুষকে বাড়তি দাম গুনতে হচ্ছে। দেখা গেছে, খাদ্য, ওষুধ, গাড়ি, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যসহ নানা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আগের সপ্তাহের তুলনায় অনেক বেশি দিতে হয়েছে। খবর আল–জাজিরার বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্সের দাম যেখানে ১ হাজার ২০০ ডলার (২৫৬ জিবি), সেখানে তেহরানের কিছু দোকানে তার দাম প্রায় ৫০০ কোটি রিয়াল (প্রায় ২ হাজার ৭৫০ ডলার)। আবার অনেক দোকান এই ফোন সরাসরি বিক্রি করতেই চাইছে না। ফরাসি ছোট আকারের গাড়ি পুজোঁ ২০৬-এর (ইরানেও উৎপাদিত হয় এবং জনপ্রিয়) দাম উঠেছে প্রায় ৩ হাজার কোটি রিয়ালে (প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ ডলার)। ফলে এই গাড়ি এখন অনেকের নাগালের বাইরে। আমদানি করা গাড়ি আরও দুর্লভ। সেগুলোর দাম কখনো কখনো প্রতিবেশী দেশ, যেমন সংযুক্ত আরব আমিরাতের তুলনায় পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেশি চাওয়া হচ্ছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন শুক্রবার এক প্রতিবেদনে গাড়ির বাজারে ‘প্রতিদিন’ মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে এর জন্য তারা মূল্যস্ফীতি-সংক্রান্ত ‘মনস্তাত্ত্বিক’ কারণ এবং মুনাফালোভী বিক্রেতাদের হাঁকা ‘ভুয়া’ দামের বিষয়টি দায়ী করেছে। ইরানে বর্তমানে মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১৭ কোটি রিয়ালের কম (প্রায় ৯২ ডলার)। চলতি পারস্য বর্ষ (২১ মার্চ শুরু) উপলক্ষে সরকার তা প্রায় ৬০ শতাংশ বাড়ালেও বাস্তবতার সঙ্গে তা এখনো সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই সঙ্গে সরকার খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে মাসে মাথাপিছু ১০ ডলারের কম ভর্তুকি দিচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তেহরানের এক বাসিন্দা বলেন, দাম আর বেতনের হিসাব দেখলে বোঝা যায়, একটার সঙ্গে আরেকটার সম্পর্ক নেই। সেই ব্যক্তি আরও বলেন, এ পরিস্থিতিতে করার তেমন কিছু নেই। যা সামান্য আছে, তা এমন কিছুর পেছনে খরচ করতে হচ্ছে, যার দাম কমবে না। অথবা এখনই এমন কিছু কিনতে হচ্ছে, যা পরে হয়তো আর কেনা সম্ভব হবে না। কেন এ অবস্থা সংবাদে বলা হয়েছে, স্থানীয় অব্যবস্থাপনা, ইরানের অবকাঠামোয় বোমাবর্ষণ, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের সঙ্গে তেহরানের কর্তৃপক্ষের আরোপ করা প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট শাটডাউন (এখন টানা ৬৫ দিন)—সব মিলিয়ে ৯ কোটির বেশি মানুষের দেশের অর্থনীতি চরম চাপের মুখে পড়েছে। দেশটির মুদ্রা রিয়ালের দরপতন অব্যাহত আছে। খোলাবাজারে ডলারের বিপরীতে রিয়াল কেবল নতুন নতুন রেকর্ড গড়ছে। প্রতি ডলারের বিপরীতে ১৮ লাখ ৪০ হাজার ইরানি রিয়াল পর্যন্ত পাওয়া গেছে। বাজারে অস্থিরতার কারণে মুদ্রা লেনদেনও ছিল সীমিত। অনিশ্চয়তার কারণে অন্যান্য বাজারেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিক্রেতা ও ক্রেতা—কেউই ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না, পরিস্থিতি কতটা খারাপ হতে পারে কিংবা নতুন পণ্য আদৌ বাজারে আসবে কি না। সরবরাহ কমে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে কিছু বিক্রেতা অস্বাভাবিক হারে দাম বাড়াচ্ছেন। গত এক দশকের উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যেও এমনটা খুব কমই দেখা গেছে। অগ্রগতির শিখর ইরানের কত মানুষ কাজ হারিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরকার এখনো সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেয়নি। তবে তেহরানের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ইসফাহানের বড় ইস্পাত কারখানা—দেশজুড়ে অধিকাংশ বড় প্রতিষ্ঠানই কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছে। শুক্রবার সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নামে প্রচারিত বিবৃতিতে বলা হয়, ইসলামি প্রজাতন্ত্র সামরিক সংঘাতে নিজেদের সক্ষমতার উল্লেখযোগ্য প্রদর্শন করেছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এখন অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে শত্রুদের ‘নিরাশ ও পরাজিত’ করতে হবে। যুদ্ধের প্রথম দিন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনিকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। বিবৃতিতে তিনি ব্যবসায়ীদের যতটা সম্ভব কর্মী ছাঁটাই থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান এবং বলেন, ‘ইরান অগ্রগতি ও উন্নতির শিখরের দিকে যাচ্ছে।’ মুদ্রার দরপতনের কারণ ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে প্রায় ৭০ ইরানি রিয়াল পাওয়া যেত। এখন তা বেড়ে ১৪ লাখ রিয়াল ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ চার দশকে ইরানের মুদ্রা মূল্য হারিয়েছে কার্যত প্রায় ২০ হাজার গুণ। এই পতনের জন্য সাধারণত নিষেধাজ্ঞা, মূল্যস্ফীতি ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতাকে দায়ী করা হয়। বিশ্বব্যাংকের মতে, তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ও দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার কারণে কার্যত ইরান অনেক সময় হারিয়ে ফেলেছে। ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দেশটির মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) গড়ে প্রতিবছর শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ হারে কমেছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকে প্রায় এক কোটি ইরানি দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী ইরানিদের হার ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৮ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

Published: প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬, ১৬: ৩০

Source: https://www.prothomalo.com/business/world-business/o9ji1o0m6d

ইরান মূল্যস্ফীতি যুদ্ধ

মন্তব্য

এখনো কোন মন্তব্য নেই

আপনার চিন্তা শেয়ার করতে প্রথম হতে!