Home Articles রাজনীতি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণরুম–গেস্টরুম বন্ধ হয়েছে, ‘ট্যাগ’ দিয়ে নির্যাতন থামেনি

আসিফ হাওলাদার May 20, 2026
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণরুম–গেস্টরুম বন্ধ হয়েছে, ‘ট্যাগ’ দিয়ে নির্যাতন থামেনি

কোনো রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠন যেন আগের মতো হল দখল, গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতি চালু করতে না পারে, এটিই শিক্ষার্থীদের চাওয়া।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো থেকে নিপীড়নমূলক গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতির অবসান হয়েছে। শিক্ষার্থীদের জোর করে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের কর্মসূচিতে নেওয়ার প্রবণতাও বন্ধ হয়েছে। বিভিন্ন হলের ক্যানটিনের খাবারের মান আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। তবে অভ্যুত্থান-উত্তর সময়ে ক্যাম্পাসে আগের মতোই ‘ট্যাগ’ দিয়ে নির্যাতন ও হেনস্তা করার সংস্কৃতি রয়ে গেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে দলটির ছা্রসংগঠন ছাত্রলীগের (এখন নিষিদ্ধ) একচ্ছত্র আধিপত্যেরও অবসান ঘটেছে। আওয়ামী লীগের (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) শাসনামলে ‘শিবির সন্দেহে’ শিক্ষার্থীদের মারধর করার বিষয়টি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রায় নিয়মিত ঘটনা। কাজটি করতেন ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীরা। এখন ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ সন্দেহে বা ফ্যাসিস্টের দোসর—এমন ট্যাগ (তকমা) দিয়ে মারধর–নির্যাতনের পর পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনা দেখা যাচ্ছে।

গণ-অভ্যুত্থানের আগে ক্যাম্পাসে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির প্রকাশ্যে কোনো কার্যক্রম চালানোর সুযোগ পেত না। অভ্যুত্থানের পর থেকে ক্যাম্পাসে শিবিরের নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে রাজনীতি করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচিত নেতৃত্বও এখন শিবিরের। বেশির ভাগ হল সংসদের নেতারাও শিবির-সমর্থিত। ছাত্রদল, বামধারার ছাত্রসংগঠন ও ইসলামপন্থী কয়েকটি ছাত্রসংগঠনের পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তিও এখন ক্যাম্পাসে সক্রিয়।

গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কী পরিবর্তন এসেছে, তা নিয়ে ১২ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁদের একজন শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের আবাসিক শিক্ষার্থী রাফসান ইসলাম। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ২০২২ সালে। বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী রাফসানের মূল্যায়ন হচ্ছে, আগে ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করত ছাত্রলীগ। হলে হলে গণরুম ছিল। গেস্টরুমে ডেকে নিয়ে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করা হতো। এসব আর নেই। ক্যানটিনের খাবারের মানেরও কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

তবে রাফসানের দৃষ্টিতে, রেজিস্ট্রার ভবনে হয়রানি, শ্রেণিকক্ষের সংকট ও ক্যাম্পাসসংলগ্ন এলাকায় ছিনতাইয়ের মতো বেশ কিছু সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। আবাসনসংকটও পুরোপুরি কাটেনি। ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের পর সহশিক্ষা কার্যক্রম কিছুটা বেড়েছে। আগে ক্যাম্পাসে যেভাবে কনসার্ট বা সাংস্কৃতিক আয়োজন হতো, সেখানে এখন কিছুটা রূপান্তর ঘটেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে ক্যাম্পাসে কাওয়ালি, সিরাত সন্ধ্যা ও পুঁথিপাঠের মতো আয়োজন বেড়েছে।

যে ১২ শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলছে প্রথম আলো, তাঁদের প্রায় সবাই বলেছেন, নবীন শিক্ষার্থীদের আবেদনের ভিত্তিতে মেধাতালিকা ও স্থায়ী ঠিকানা বিবেচনায় হল প্রশাসন এখন আসন বণ্টন করছে। বিভিন্ন হলের পাঠকক্ষের পরিবেশও আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে। আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক ছিল। ভবনটিও ছিল স্যাঁতসেঁতে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর এটি মেরামত করে উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম আনা হয়েছে। চিকিৎসাকেন্দ্রের উন্নয়নে কাজ চলমান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হল আছে ১৮টি। ছাত্রদের জন্য ১টি আর ছাত্রীদের জন্য ৫টি। এর বাইরে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আরেকটি হল আছে। এ ছাড়া হোস্টেল আছে ৫টি। এসব হোস্টেল কোনো না কোনো হলের অধীন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্র জানায়, বিভিন্ন হলে প্রায় ১৯ হাজার শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা আছে। তবে হলে থাকেন প্রায় ২২ হাজার শিক্ষার্থী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৭ হাজার ১৮। আর শিক্ষক আছেন ১ হাজার ৯৯২ জন।

‘গেস্টরুম’ আর না ফিরুক

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে হলের কোন কক্ষে কে থাকবেন, তা নির্ধারণ থেকে শুরু করে ক্যানটিনের নিয়ন্ত্রণ—সবই ছিল ছাত্রলীগের কাছে। হলের ক্যানটিনে কিছু নেতার বাকির নামে ‘ফাও খাওয়া’ ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ছিল। সেই টাকা ‘উশুল’ করতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করতেন ক্যানটিন ব্যবস্থাপকেরা।

আওয়ামী লীগ আমলে প্রস্তুতি ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক বিভাগ-ইনস্টিটিউট খোলা হলেও সে অনুযায়ী আবাসনসুবিধা বাড়ানো হয়নি। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ে তীব্র আবাসনসংকট তৈরি হয়। ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পরও অনেকে হলে থাকতেন, ফলে সংকট আরও বাড়ে। এই পরিস্থিতিতে তৈরি হয় ‘গণরুম’ ব্যবস্থা, যেখানে নবীন শিক্ষার্থীদের গাদাগাদি করে রাখা হতো। এ ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল রাজনৈতিক আনুগত্যের বাধ্যবাধকতা। ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে অংশ না নিলে হলে থাকা কঠিন হয়ে পড়ত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারদা সূর্য সেন হলে ‘লাদেন গুহা’ নামে গণরুমে আগে ৬০ জনের মতো শিক্ষার্থী থাকতেন। সেই গণরুমে এখন আর কেউ থাকেন না। শিক্ষার্থীদের খেলার কক্ষ হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়। জহুরুল হক হলের টিনশেড ভবনের ১৮ নম্বর কক্ষে (গণরুম) ২৫ জনের বেশি থাকতেন, এখন সেখানে থাকেন ৮ জন। একই হলের বর্ধিত ভবনের ১০১৩ ও ১০১৪ নম্বর কক্ষে আগে ৩০ জন করে ৬০ জন শিক্ষার্থী থাকতেন, এখন সেখানে থাকছেন ৮ জন।

অন্যদিকে গেস্টরুম ছিল ছাত্রলীগের একধরনের ‘আদালত’। সেখানে ‘ম্যানার’ (আচরণ) শেখানোর নামে শিক্ষার্থীদের কখনো মানসিক, কখনো শারীরিক নির্যাতন করা হতো। ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে না গেলে গেস্টরুমে বিচার হতো। সেই নিপীড়ন এখন আর নেই।

পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেন ক্যাম্পাসে আর না ফেরে, এটিই এখন সবার চাওয়া বলে প্রথম আলোকে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী দ্বীপজয় সরকার। তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠন যেন আগের মতো হল দখল, গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতি চালু করতে না পারে, এটি যেকোনোভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

গণ–অভ্যুত্থানের পর বিএনপির ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির, এনসিপির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির পাশাপাশি বামপন্থী ও ইসলামপন্থী ছাত্রসংগঠনের নেতারা গণরুম-গেস্টরুম এবং ফাও খাওয়ার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কথা বলছেন।

ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, গণরুম-গেস্টরুম প্রথা ফেরার সুযোগ নেই। আগে জবরদস্তিমূলক রাজনীতির কারণে ছাত্রলীগ প্রশাসনের মাধ্যমে হলে সিট (আসন) বণ্টন নিয়ন্ত্রণ করত। সেই পরিস্থিতিও এখন আর নেই।

হলে আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে কোনো ছাত্রসংগঠনের সংশ্লিষ্টতা থাকা উচিত নয় বলে মনে করেন ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও ডাকসুর এজিএস মুহা. মহিউদ্দিন খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অতীতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন হল নিয়ন্ত্রণ করত এবং প্রশাসনও তাদের প্রভাবাধীন ছিল। এ প্রবণতা বন্ধ হয়েছে।

গেস্টরুম ও গণরুমে নির্যাতনের ঘটনাগুলো শিক্ষার্থীদের জানাতে চলতি মে মাসের প্রথম সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হলের অতিথিকক্ষ ‘গেস্টরুমের আমলনামা’ এমন একটি ব্যানার টাঙিয়েছে ছাত্রদল। এতে ছাত্রশিবির, হল সংসদের নেতাসহ মোট ছয়জনের বিরুদ্ধে অতীতে গেস্টরুম নির্যাতনে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। এর ‘প্রমাণ’ হিসেবে কয়েকজন শক্ষার্থীর কাছে পাঠানো কয়েকটি খুদে বার্তার স্ক্রিনশটও ব্যানারে যুক্ত করে দেওয়া হয়।

গেস্টরুমের আমলনামা প্রকাশের বিষয়ে জহুরুল হক হল শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক হাসিবুর রহমান ৫ মে প্রথম আলোকে বলেন, যাঁরা গণরুমে ছিলেন, তাঁদের অনেকের কাছে বিকল্প ছিল না। আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় চাপে পড়ে তাঁরা সেখানে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু যাঁরা গেস্টরুম ‘কল’ (ডেকে নেওয়া) করেছিলেন এবং শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেছিলেন, তাঁরা চাপে পড়ে এসব করেননি। এটি ছিল একেবারেই অতিরিক্ত ‘ছাত্রলীগগিরি’ দেখানোর জন্য। তাঁরা অন্য সংগঠন থেকে গুপ্ত অবস্থায় ছাত্রলীগের অংশ হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করার জন্য এ অত্যাচার ও নিপীড়নের পথ বেছে নিয়েছিলেন।

‘মব’ আতঙ্ক

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ-মারামারির ঘটনা আগের চেয়ে অনেক কমেছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘মব’ আতঙ্ক দেখা দেয়। এ ধরনের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ বেশি উঠেছে ছাত্রশিবিরের সমর্থনে নির্বাচিত হওয়া ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক যুবাইর বিন নেছারী (এ বি জুবায়ের) এবং সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া ছাত্রশক্তির কিছু নেতা–কর্মীর বিরুদ্ধেও মবে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

তবে মবের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি পুরোপুরি মিথ্যাচার এবং ট্যাগিং বলে দাবি করেন ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘মানুষের চাওয়া-পাওয়ার জায়গা থেকে বিভিন্ন অন্যায়ের প্রতিবাদ আমরা (জুবায়ের ও মুসাদ্দিক) জানিয়েছি। বিভিন্ন মুভমেন্ট আমরা তৈরি করেছি। এখন এটাকে যদি মব বলে, তাহলে তো গণতান্ত্রিক আন্দোলন বলে কিছু থাকে না।’

গত ৯ মার্চ পবিত্র রমজান মাসে সাহ্‌রির সময় ক্যাম্পাসে মারধর করে রক্তাক্ত করা হয় ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র রাহিদ খানকে (পাভেল নামে পরিচিত)। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, তিনি ছাত্রলীগ করতেন এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িত ছিলেন। যদিও তিনি এসব অভিযোগকে অসত্য বলেছেন। রাহিদের ওপর ওই হামলায় জড়িত ছিলেন ছাত্রশক্তির কিছু নেতা-কর্মী।

এ ঘটনায় এমন কিছু ধরন দেখা গেছে, যা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও দেখা যেত। যেমন ক্যাম্পাসে কাউকে ঢুকতে না দেওয়ার চেষ্টা করা, মুঠোফোন চেক করা। রাহিদের ওপর হামলায় অভিযুক্ত ছাত্রশক্তির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সাইফুল্লাহ ৯ মার্চ প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ধরার পর ফোন চেক করতে গেলে রাহিদ উল্টো ‘রিঅ্যাক্ট’ করেন। পরে তাঁকে থানায় দেওয়া হয়।

রাহিদের ওপর হামলার দুই দিন আগে চানখাঁরপুল এলাকায় মাইকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোর ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে আটক করে পুলিশ। এর প্রতিবাদে শাহবাগ থানার সামনে মাইকে ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোর কর্মসূচি দেন শামসুন নাহার হল সংসদের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ (ইমি)। সেখানে ইমির সঙ্গে ছিলেন শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের সহসম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন। তাঁকে মারধর করেন মোসাদ্দেক ইবনে আলী মোহাম্মদ এবং এ বি জুবায়ের। মারধরে ছাত্রশক্তির কয়েকজন নেতা-কর্মীও যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে ইমিকেও হেনস্তা করা হয়। পরে শাহবাগ থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ইমি, মামুনসহ তিনজনকে কারাগারে পাঠানো হয়। দুই মাস জেল খেটে ৭ মে ইমি জামিনে মুক্তি পান।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামা উদ্দীনের হেনস্তার শিকার হওয়ার ঘটনাটিও আলোচিত হয়েছিল। ডাকসু নেতা এ বি জুবায়ের এ হেনস্তায় যুক্ত ছিলেন।

অবশ্য ২৪ এপ্রিল শাহবাগ থানায় মবের শিকার হন ডাকসু নেতা এ বি জুবায়ের ও মুসাদ্দিক। সেদিন তাঁদের মারধর করেন ছাত্রদলের কিছু নেতা-কর্মী। পরে দুজনকে উদ্ধারে ভূমিকা রাখেন ছাত্রদলেরই কয়েকজন শীর্ষ নেতা।

মুসাদ্দিক এবং এ বি জুবায়েরকে ছাত্রশিবিরের ‘গুপ্ত নেতা’ বলে মনে করেন ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এই দুজনকে সামনে রেখে ক্যাম্পাসে শিবির তাদের গুপ্ত নেতা–কর্মীদের দিয়ে মব তৈরি করে। এসব মবের মাধ্যমে বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করে শিবির।

তবে শিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক মিফতাহুল হোসাইন আল মারুফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের কাজ শিক্ষার্থীরা গ্রহণ করছে কি না, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নির্দিষ্ট বর্গের ছাত্রসংগঠন বা নির্দিষ্ট চিন্তার মানুষেরা আমাদের কী নামে ট্যাগিং করলেন, কী অভিযোগ দিলেন, তা নিয়ে আমাদের ভিন্নভাবে ভাবার সুযোগ নেই।’

‘অভ্যুত্থান-উত্তর বিশ্ববিদ্যালয়: সাম্প্রতিক বাস্তবতা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলেছে, নিপীড়ন এবং মবের যে ঘটনাগুলো আবার ক্যাম্পাসে দেখা যাচ্ছে, তাতে ভয়ের সংস্কৃতি ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত শনিবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় শিক্ষক নেটওয়ার্ক আরও বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘প্রেশার গ্রুপ’ নাম দিয়ে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে নীতি পুলিশিংকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর নতুন করে আক্রমণকারী শক্তি হিসেবে নির্বাচিত শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের আবির্ভাব দেখা গেছে।

‘নীতি পুলিশিং’

মবের পাশাপাশি আরও কিছু ঘটনা ক্যাম্পাসে আতঙ্ক তৈরি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। যেমন গত বছরের অক্টোবরে ডাকসু নেতা এ বি জুবায়ের ও সর্বমিত্র চাকমার নেতৃত্বে যে প্রক্রিয়ায় ক্যাম্পাস থেকে হকার উচ্ছেদ করা হয়, তা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন ওঠে। উচ্ছেদের সময় অনেক হকারকে মারধর করারও অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া গত জানুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে কয়েকজন তরুণ ও কিশোরকে কানে ধরিয়ে ওঠবস করিয়ে আলোচনার জন্ম দেন শিবির প্যানেল থেকে ডাকসুর সদস্য নির্বাচিত হওয়া সর্বমিত্র চাকমা। গত জানুয়ারিতে এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা হয়। এর আগে গত নভেম্বরে ক্যাম্পাসে একজন প্রবীণ ব্যক্তিকে লাঠি হাতে তিনি শাসান। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়।

এখন মবের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন খুবই কঠোর বলে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) োহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী। তিনি বলেন, ‘মবের ব্যাপারে আমাদের বার্তা অত্যন্ত পরিষ্কার। যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোথাও কোনো ধরনের মব তৈরির চেষ্টা হয়, তাহলে বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেবে।’

কিছু সংকট রয়ে গেছে

আওয়ামী লীগ শাসনামলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সহ-উপাচার্য, হল প্রাধ্যক্ষসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে আওয়ামীপন্থী শিক্ষক ছাড়া অন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হতো না। বর্তমান বিএনপি সরকারের শাসনামলেও একই ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে এখন রয়েছেন বিএনপিপন্থী শিক্ষকেরা। জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে গত দুই বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নির্বাচনও দুই বছর ধরে হচ্ছে না।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় উপাচার্য পদ বিভিন্ন দলের মধ্যে ভাগাভাগি হয়েছিল—এমন মন্তব্য গত শনিবার শিক্ষক নেটওয়ার্কের আলোচনা সভায় বলেছিলেন ইউজিসির সাবেক সদস্য মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর অছাত্ররা হল ছাড়ায় আবাসনসংকট আগের চেয়ে কমেছে। তবে এ সংকটও পুরোপুরি কাটেনি, বিশেষ করে প্রথম বর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের সবাই হলে আসন পাচ্ছেন না।

এর বাইরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে আসনসংকট এবং কিছু বিভাগের শ্রেণিকক্ষসংকটও রয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় এবং বিজ্ঞান গ্রন্থাগারের আসনসংখ্যা ১ হাজার ৯০০। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ১ হাজার ৩০০ জনের আসন রয়েছে। শিক্ষার্থী সংখ্যার অনুপাতে এই আসন অপর্যাপ্ত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে শ্রেণিকক্ষের সংকট বেশি। এই ভবনে থাকা বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে মনোবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, উর্দু, দর্শন, বাংলা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটে শ্রেণিকক্ষের সংকট সবচেয়ে বেশি। এসব বিভাগের শিক্ষার্থীদের একেক সময় একেক তলায় গিয়ে গিয়ে ক্লাস করতে হয়।

বিদেশি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কারও সনদ যাচাইয়ের জন্য যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়, তখন সেই সেবার জন্য ফি নেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে ক্ষোভ আছে শিক্ষার্থীদের। ৭ এপ্রিল বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচিও পালন করেন একদল শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কার্যালয়ের সামনে ‘মেইল ভেরিফিকেশন ও কল রিসিভ’ শিরোনামে ব্যতিক্রমী প্রতীকী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি করেন তাঁরা। শিক্ষার্থীরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনায় বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়কে ই-মেইল পাঠাতে অনেক বেশি সময় নেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, অনেক সময় উত্তরও দেয় না। এ পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে ওই কর্মসূচিতে বলা হয়।

ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে বর্তমান প্রশাসন আন্তরিক বলে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী। তিনি বলেন, আগে যা কিছুই হোক, এখন থেকে সবকিছু নিয়মের আলোকে করার চেষ্টা করছেন তাঁরা।

Published: আপডেট: ২০ মে ২০২৬, ০৪: ৩৫

Source: https://www.prothomalo.com/politics/x9licvfjpu

ছাত্রলীগ ইসলামী ছাত্রশিবির ছাত্রদল ছাত্র রাজনীতি বিশেষ সংবাদ নির্যাতন শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Comments

No comments yet

Be the first to share your thoughts!