Home Articles কলাম

দেয়ালের উচ্চতায় নয়, বিচারব্যবস্থার শক্তি জনগণের বিশ্বাসে

লেখা: August 15, 2026
দেয়ালের উচ্চতায় নয়, বিচারব্যবস্থার শক্তি জনগণের বিশ্বাসে

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার লাভের অধিকারী।’ বিচার কেন প্রকাশ্য আদালতে হবে? এর উত্তর এক শতাব্দীর বেশি আগে দিয়েছেন ইংরেজ বিচারপতি লর্ড হিউয়ার্ট। ১৯২৪ সালে এক ঐতিহাসিক রায়ে তাঁর সেই কালজয়ী উক্তি ছিল, ‘ন্যায়বিচার শুধু হতে হবে না, ন্যায়বিচার যে হয়েছে, তা জনগণের কাছেও দৃশ্যমান হতে হবে।’

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তি আইসিসিপিআরের সদস্যরাষ্ট্র। ফলে এ চুক্তিতে স্বীকৃত প্রকাশ্য বিচারের পাবলিক হিয়ারিং নীতি সমুন্নত রাখার আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারও বাংলাদেশের রয়েছে। আইসিসিপিআরের ১৪১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোনো ফৌজদারি অভিযোগ নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যক্তি আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত যোগ্য, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে ন্যায্য ও প্রকাশ্য শুনানির অধিকারী।’

লক্ষণীয় যে এই নীতিই বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদে প্রতিফলিত হয়েছে। অর্থাৎ প্রকাশ্য বিচার কেবল সংবিধানপ্রদত্ত একটি অধিকারই নয়, এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনেরও একটি স্বীকৃত মৌলিক নীতি।

এই ‘প্রকাশ্য বিচার’ কেবল অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার নয়, এটি রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অন্যতম ভিত্তি। ‘প্রকাশ্য বিচার’ বলতে আমরা কী বুঝি? আদালতের দরজা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি ছাড়া, আদালতের বিশেষ কোনো নির্দেশ না থাকলে শুনানি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং যে কেউ আদালতকক্ষে উপস্থিত থেকে তা পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। গণমাধ্যমও আদালতের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। সাংবাদিকেরা শুনানি শুনতে, নোট নিতে এবং আইনসম্মতভাবে সংবাদ প্রকাশ করতে পারবেন।

আমাদের সংবিধানের দর্শনই হলো, বিচার গোপনে হবে না। বিচারক কীভাবে শুনানি পরিচালনা করছেন এবং কী যুক্তিতে সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন, তা জনগণের সামনে দৃশ্যমান থাকবে। রায় প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হবে। সাধারণ নীতি হলো আদালতের রায় প্রকাশ্যে উচ্চারণ বা প্রকাশ করা। কিন্তু কয়েক মাস হলো দেশের কিছু আদালত, বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন আদালতকক্ষে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।

স্বাধীনতার পর থেকে সুপ্রিম কোর্টে সাংবাদিকদের প্রবেশ ছিল একটি দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ও গ্রহণযোগ্য রীতি। গত পাঁচ দশকের বেশি সময়ে ২৫ জন প্রধান বিচারপতির আমলে সংবাদকর্মীরা আদালতকক্ষে প্রবেশ করে শুনানি পর্যবেক্ষণ করেছেন, নোট নিয়েছেন এবং সংবাদ প্রকাশ করেছেন।

অবশ্যই জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বা বহুল আলোচিত মামলার শুনানিতে আদালতকক্ষে স্থান সংকুলানের সমস্যা দেখা দিতে পারে। অতীতেও এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সে সময় সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষ ও সাংবাদিক নেতারা পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। যেমন সাংবাদিকদের জন্য নির্দিষ্ট এক বা দুটি সারি সংরক্ষণ করা, আসন পূর্ণ হয়ে গেলে অতিরিক্ত সাংবাদিকদের আদালতকক্ষে প্রবেশ না করা এবং আদালতের ভেতরে দাঁড়িয়ে অবস্থান না করার মতো শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছিল। ফলে আদালতের শৃঙ্খলা যেমন বজায় ছিল, তেমনি গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকারও অক্ষুণ্ন ছিল।

এই উন্মুক্ত বিচারপদ্ধতি সুপ্রিম কোর্টের প্রতি জন-আস্থা ও মর্যাদা আরও সুদৃঢ় করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের কিছু বেঞ্চে সাংবাদিকদের প্রবেশে প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। এটি একটি নতুন বাস্তবতা, যা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্নটি কোনো নির্দিষ্ট মামলাকে কেন্দ্র করে নয়; প্রশ্নটি বিচারব্যবস্থার উন্মুক্ত চরিত্র ও সাংবিধানিক দর্শন নিয়ে। বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।

যুক্তরাজ্যে সুপ্রিম কোর্টের শুনানি শুধু সাংবাদিকদের জন্য উন্মুক্ত নয়, তা নিয়মিত সরাসরি সম্প্রচারও করা হয়। আদালতের ভেতরে ক্যামেরা ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা থাকলেও শুনানির তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছানোর পথ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। কানাডার সুপ্রিম কোর্টও নিয়মিত শুনানির ভিডিও সম্প্রচার করে।

যুক্তরাষ্ট্রে সুপ্রিম কোর্টে টেলিভিশন ক্যামেরা এখনো অনুমোদিত নয়। কিন্তু সাংবাদিকেরা আদালতকক্ষে উপস্থিত থেকে শুনানি পর্যবেক্ষণ করেন এবং আদালত নিজেই শুনানির অডিও প্রকাশ করেন। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আদালতে আবার বিচারকের অনুমতি সাপেক্ষে টেলিভিশন ক্যামেরাও ব্যবহৃত হয়। অস্ট্রেলিয়াসহ অধিকাংশ দেশে যেখানে ‘কমন ল’ প্রচলিত, সেখানেও আদালত সংবাদমাধ্যমের জন্য উন্মুক্ত, যদিও আদালতের ভেতরে ছবি বা ভিডিও ধারণের ক্ষেত্রে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ রয়েছে।

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এক ধাপ এগিয়ে গেছে। ২০১৮ সালে ‘স্বপ্নিল ত্রিপাঠী বনাম ভারতের সুপ্রিম কোর্ট’ মামলায় আদালত রায় দেন যে আদালত জনগণের প্রতিষ্ঠান; তাই ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়াও জনগণের জন্য উন্মুক্ত হওয়া উচিত। আদালত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক মামলার ‘লাইভ স্ট্রিমিং’-এর অনুমতি দেন এবং বলেন, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জনগণের তথ্য জানার অধিকারকে আরও শক্তিশালী করে।

বর্তমানে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বেঞ্চের শুনানি নিয়মিত সরাসরি সম্প্রচার করে। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক বিশ্বে প্রবণতা হলো আদালতকে ক্রমেই আরও উন্মুক্ত করা। কোথাও ক্যামেরা নিয়ন্ত্রিত, কোথাও লাইভ সম্প্রচার সীমিত; কিন্তু সাংবাদিকদের প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক বিচারব্যবস্থায় অত্যন্ত বিরল।

অবশ্যই কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। শিশু, যৌন নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি, জাতীয় নিরাপত্তা, রাষ্ট্রের গোপন তথ্য কিংবা সাক্ষীর নিরাপত্তার মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে আদালত ক্যামেরা ট্রায়াল করতে পারেন অথবা শুনানির জন্য বিশেষ কোনো নির্দেশ দিতে পারেন। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও ন্যায়সংগত ব্যতিক্রম। কিন্তু ব্যতিক্রম যদি ধীরে ধীরে সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়, তাহলে ‘প্রকাশ্য বিচার’-এর সাংবিধানিক দর্শনই দুর্বল হয়ে পড়ে।

এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। সাংবাদিকদের আদালতে প্রবেশের অর্থ এই নয় যে তাঁরা বিচার পরিচালনা করবেন বা বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করবেন। আদালত অবমাননা আইন, বিচারিক শৃঙ্খলা এবং সাংবাদিকতার পেশাগত নীতিমালা তাঁদের ওপর সমানভাবে প্রযোজ্য। ভুল, বিভ্রান্তিকর বা পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ প্রকাশের জন্য বিদ্যমান আইনেই প্রতিকারের ব্যবস্থা রয়েছে। একইভাবে আদালতের শৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তা মোকাবিলার জন্যও প্রচলিত আইন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিদ্যমান। কিন্তু সম্ভাব্য অপব্যবহারের আশঙ্কায় পুরো গণমাধ্যমকে আদালতের বাইরে রাখা একটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অপ্রয়োজনীয় প্রতিকার।

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় জনগণের আস্থা অর্জনের অন্যতম ভিত্তি আদালতের উন্মুক্ততা। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে যদি সেই উন্মুক্ততার পরিসর সংকুচিত হয়, তাহলে বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে অপ্রয়োজনীয় সন্দেহ, জল্পনা ও অবিশ্বাসের জন্ম নিতে পারে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যেমন সংরক্ষণ করতে হবে, তেমনি জনগণের জানার অধিকারও সমানভাবে সম্মান করতে হবে। এই দুইয়ের মধ্যে কোনো মৌলিক দ্বন্দ্ব নেই; বরং একটির শক্তি অন্যটিকে আরও সমৃদ্ধ করে।

সময়ের দাবি হলো, সুপ্রিম কোর্ট একটি সুস্পষ্ট ও লিখিত নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারেন, যেখানে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার, আসনব্যবস্থা, আচরণবিধি এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রবেশ সীমিত করার শর্তাবলি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকবে। এতে আদালতের শৃঙ্খলা যেমন অক্ষুণ্ন থাকবে, তেমনি গণমাধ্যমও তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারবে।

সবশেষে একটি মৌলিক সত্য মনে রাখা প্রয়োজন—বিচারব্যবস্থার শক্তি তার ‘দেয়ালের উচ্চতায়’ নয়, জনগণের বিশ্বাসে। আর সেই বিশ্বাসের অন্যতম ভিত্তি একটি উন্মুক্ত আদালত, যেখানে ন্যায়বিচার শুধু করা হয় না, জনগণও নিশ্চিত হতে পারেন যে ন্যায়বিচার সত্যিই হচ্ছে।

সালেহ উদ্দিন ল রিপোর্টার্স ফোরামের সাবেক সভাপতি

মতামত লেখকের নিজস্ব

Published: প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১১: ০১

Source: https://www.prothomalo.com/opinion/column/uv2npmaqey

লেখকের কলাম

Comments

No comments yet

Be the first to share your thoughts!