দেনমোহর নির্ধারণে ইসলামের বিধি-বিধান ও নির্দেশনা

বিয়ে ইসলামে নারী-পুরুষের বৈধ সম্পর্ক ও ভালোবাসার একমাত্র স্বীকৃত মাধ্যম। এই সম্পর্কের অন্যতম অপরিহার্য শর্ত হলো দেনমোহর, যা কোনো আনুষ্ঠানিক অঙ্ক নয়; বরং স্ত্রীর ন্যায্য ও শরিয়তস্বীকৃত অধিকার। ইসলামী বিধান অনুযায়ী, এ দেনমোহর পরিশোধ করা স্বামীর অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব। কিন্তু...
বিয়ে ইসলামে নারী-পুরুষের বৈধ সম্পর্ক ও ভালোবাসার একমাত্র স্বীকৃত মাধ্যম। এই সম্পর্কের অন্যতম অপরিহার্য শর্ত হলো দেনমোহর, যা কোনো আনুষ্ঠানিক অঙ্ক নয়; বরং স্ত্রীর ন্যায্য ও শরিয়তস্বীকৃত অধিকার। ইসলামী বিধান অনুযায়ী, এ দেনমোহর পরিশোধ করা স্বামীর অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব। কিন্তু বর্তমান সমাজে এর ধর্মীয় গুরুত্ব অনেকাংশেই উপেক্ষিত হচ্ছে এবং বিষয়টি কেবল কাবিননামার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
ইসলামি শরিয়তে বিয়ে সম্পাদনের জন্য দেনমোহর অপরিহার্য। এটি নিছক কোনো উপহার বা দান নয়, বরং স্ত্রীর অধিকার। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের থেকে যে স্বাদ গ্রহণ করো, তার বিনিময়ে অপরিহার্য ফরজ হিসেবে তাদের মোহর পরিশোধ করো।’ (সুরা নিসা: ২৪)
দেনমোহরের পরিমাণ ও আদায়ের সীমা ইসলামে দেনমোহরের সর্বোচ্চ কোনো সীমা নেই। স্বামীর সামর্থ্য, স্ত্রীর সামাজিক মর্যাদা ও পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে এটি নির্ধারিত হয়। তবে হানাফি মাজহাবের মতে, দেনমোহরের একটি সর্বনিম্ন সীমা রয়েছে। তা হলো ১০ দিরহাম, যা বর্তমান হিসাবে প্রায় ৩০.৬১৮ গ্রাম রুপা বা এর সমপরিমাণ অর্থ। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘১০ দিরহামের কম কোনো মোহর নেই।’ (সুনানে বায়হাকি)
সামর্থ্যবান স্বামী হলে স্ত্রীকে বেশি পরিমাণে মোহর দিতে পারেন, এতে ইসলামের কোনো আপত্তি নেই। তবে তা যেন কোনোভাবেই লোক দেখানো বা সামাজিক অহংকার প্রদর্শনের (রিয়া) জন্য না হয়।
মোহর পরিশোধ না করার পরিণতি আজকাল অনেক বিয়েতে লোক দেখানো বা আভিজাত্য প্রকাশের জন্য অলীক অঙ্কের (যেমন ২০ বা ৫০ লাখ টাকা) দেনমোহর ধার্য করা হয়, যা পরিশোধের সামর্থ্য বা নিয়ত বরের থাকেই না। ইসলামে এই প্রবণতাকে মারাত্মক গুনাহের কাজ বলে হুঁশিয়ার করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো একটা পরিমাণ মোহরানা ধার্য করে কোনো নারীকে বিয়ে করল, অথচ আল্লাহ জানেন যে তা পরিশোধ করার ইচ্ছে তার নেই; এ ব্যক্তি আল্লাহর নামে তার স্ত্রীকে প্রতারিত করল এবং অন্যায়ভাবে তার সতীত্ব নিজের জন্য হালাল মনে করে ভোগ করল। এমন ব্যক্তি কিয়ামতের দিন ‘জিনাকারী বা ব্যভিচারী’ হিসেবে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে।’ (মুসনাদে আহমদ)
বিয়ে হোক সহজ, থাকুক বরকত জাহেলিয়াত বা অন্ধকার যুগে মোহরানা নিয়ে কনেপক্ষ ও বরপক্ষের মধ্যে তুমুল দর-কষাকষি হতো এবং লোকদেখানো বড় অঙ্ক ধার্য করে পরবর্তী সময়ে ঝগড়া-বিবাদ তৈরি হতো। বর্তমান আধুনিক সমাজেও সেই জাহেলি সংস্কৃতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। দেনমোহর নিয়ে কড়াকড়ি কিংবা বরপক্ষকে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া ইসলাম সমর্থন করে না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সর্বোত্তম পরিমাণের মোহর হচ্ছে তা, যা পরিশোধ করা সহজসাধ্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘নিশ্চয় বরকতের দিক দিয়ে সর্বোত্তম ও গ্রহণযোগ্য বিয়ে হলো তা, যা সবচেয়ে স্বল্প খরচে সম্পাদিত হয়।’ (সুনানে বায়হাকি, শুআবুল ইমান)
মানবজীবনে বিয়ে একটি পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক, যা নৈতিকতা রক্ষা এবং পারিবারিক স্থিতি নিশ্চিত করতে সহায়ক। এ কারণে দেনমোহর নির্ধারণে বাস্তবতা ও সামর্থ্যের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে দাম্পত্য জীবনের শুরুতেই স্ত্রীর প্রাপ্য মোহর পরিশোধ করে বৈবাহিক সম্পর্কে বরকত ও পারস্পরিক আস্থা প্রতিষ্ঠা করা প্রতিটি মুসলিম পুরুষের কর্তব্য।
Published: প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬, ১১:৪৭
Comments
No comments yet
Be the first to share your thoughts!