চিকিৎসকের পদ ৭৪টি, কর্মরত আছেন মাত্র ২৩ জন
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের শয্যা, মেঝে, বারান্দা—সব জায়গায় রোগী আর তাঁদের স্বজনদের ভিড়। রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম অবস্থা চিকিৎসক ও নার্সদের। এর মধ্যে ভ্যাপসা গরমে সবার হাঁসফাঁস অবস্থা। গতকাল শনিবার দুপুরে সুনামগঞ্জের ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের চিত্র ছিল এমনই।
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে শয্যা আছে ৫০টি। গতকাল ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ২২৫। একজন নার্স জানান, রোগী আরও আছে। ভিড়ের কারণে সবার নাম লেখা হয়নি ভর্তির নিবন্ধন খাতায়।
শুধু শিশু ওয়ার্ড নয়, গতকাল দুপুর পর্যন্ত ২৫০ শয্যার এ হাসপাতালে রোগী ভর্তি ছিল ৮৯১ জন। এক চিকিৎসক আক্ষেপ করে বলছিলেন, এ হাসপাতালে চিকিৎসকসংকট প্রকট। এখানে ৪৮ জন মেডিকেল অফিসারের মধ্যে আছেন মাত্র ১২ জন।
শিশু ওয়ার্ডের বারান্দার মেঝেতে তিন মাস বয়সী মেয়ে জান্নাতকে নিয়ে বসে ছিলেন দিরাই উপজেলা থেকে আসা জহুরুল ইসলাম। তিনি জানান, মেয়ের শ্বাসকষ্ট। অনেক অনুরোধ করে একটা ফোম (বিছানা) জোগাড় করেছেন। চার দিন ধরে মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে আছেন তিনি।
পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই, তবু বদলি
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গতকাল দুপুর পর্যন্ত শিশু ওয়ার্ডে ২২৫ জন, হাম ওয়ার্ডে ১৪৪ জন, ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ১২২ জন, নারী ওয়ার্ডে ১৫৩ জন, পুরুষ ওয়ার্ডে ৯৪ জন, প্রসূতি ওয়ার্ডে ৬২ জন, অন্যান্য ওয়ার্ডে আরও ১০১ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। এ ছাড়া হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন সেবা নেন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ জন।
হাসপাতালে চিকিৎসকের পদ আছে ৭৪টি, কর্মরত আছেন ২৩ জন। অর্থাৎ ৫১টি পদ শূন্য। নার্সের পদ আছে ২৬৩টি। কর্মরত আছেন ১৯৩ জন, শূন্য পদ ৭০টি। মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ অন্যান্য পদ আছে ১৩৬টি, এর মধ্যে ৮৮টিই শূন্য। অনেক বিভাগে সিনিয়র ও জুনিয়র কনসালট্যান্ট নেই। এমন সংকটের মধ্যেই গত মাসে পাঁচজন চিকিৎসককে এখান থেকে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজে বদলি করা হয়েছে। অথচ সেখানে এখনো হাসপাতালই চালু হয়নি। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের একপর্যায়ে তাঁদের সেখানে বদলি করা হয়।
জেলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (উপপরিচালক) নিজেও সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্বে আছেন। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, আরও কয়েকজন চিকিৎসকের বদলি প্রক্রিয়াধীন আছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আহম্মদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসকসহ জনবলসংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
ভিড়ে দুর্ভোগের শেষ নেই
শিশু ওয়ার্ডের ভেতরে সাত মাস বয়সী ছেলে রিহানকে বই দিয়ে বাতাস করছিলেন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালাম। এক সপ্তাহ আগে ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। এখনো শয্যা পাননি। কাগজপত্রে হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও শহরের এক আত্মীয়ের বাড়িতে রাতে ছেলেকে নিয়ে থাকেন। সকালে আবার আসেন এখানে।
আবদুস সালাম বলেন, ‘খুবই খারাপ অবস্থা। রোগী ও মানুষের চাপে টেকা দায়। তাই ইনজেকশন দেওয়ার জন্য খালি দিনে আসি।’
মেঝেতে রাখা ১০ বছর বয়সী লাকির পাশে কাঁদছিলেন তার বাবা শাহ আলম। জানালেন, মেয়ের বুক বেশি ধড়ফড় করে। একজন চিকিৎসক এসে স্যালাইন দিতে বলে গেছেন।
শাহ আলম বলেন, ‘মানুষের ভিড়, ঠেলাঠেলি লাইগা আছে। ডাক্তার সাবরে সবাই ঘিইরা রাখছে। আমি কাছেই ভিড়তাম পারলাম না।’
চিকিৎসক, নার্সসহ লোকবলের সংকটের বিষয়টি উল্লেখ করে হাসপাতালের নার্সিং সুপারিনটেন্ডেন্ট মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘তিন গুণ–চার গুণ রোগীর চাপ। আমরা সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছি। তারপরও চুন থেকে পান খসলেই আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়। ংকটের বিষয়টি অনেকে বুঝতে চান না, এটাই আমাদের দুঃখ।’
এ হাসপাতালে চিকিৎসকসহ লোকবলের সংকট বহুদিনের বলে উল্লেখ করেন সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি কানিজ সুলতানা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, যেখানে আরও চিকিৎসক দরকার, সেখানে একসঙ্গে পাঁচজন চিকিৎসককে বদলি করার বিষয়টি দুঃখজনক। সুনামগঞ্জের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত এখানে প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ দিতে সরকারের কাছে দাবি জানান তিনি।
Published: প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০৬: ৩২
Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/ap941m91iy
Comments
No comments yet
Be the first to share your thoughts!