ভোক্তার রুচির বদল: চায়ের ব্র্যান্ডের প্রতিযোগিতা
বাঙালির প্রাত্যহিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ চা। সকালে ঘুম থেকে ওঠা হতে শুরু করে বন্ধুদের আড্ডায়, অফিসের ব্যস্ততায় বা অতিথি আপ্যায়নে এক কাপ চা না হলে যেন আমাদের চলেই না। একসময় যা ছিল নিছক একটি সাধারণ পানীয় বা ব্রিটিশদের আভিজাত্যের প্রতীক, তা আজ দেশের একটি বৃহৎ ও অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক শিল্পে পরিণত হয়েছে। উৎপাদন ও ক্রমবর্ধমান চাহিদার আড়ালে দেশের চায়ের বাজারে পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট। একদিকে চলছে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাজার দখলে নানা ব্র্যান্ডের লড়াই, অন্যদিকে দ্রুত বদল ঘটছে ভোক্তাদের রুচি ও পছন্দে।
দেশের চায়ের বাজার এখন আর কেবল সাধারণ খোলা চা বা গতানুগতিক পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্যাকেটজাত চা এবং টি-ব্যাগের আধিপত্যে বাজার এখন তুমুল প্রতিযোগিতামূলক। দেশের শীর্ষস্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও শিল্পগোষ্ঠীগুলো এই বিশাল বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রতিনিয়ত উদ্ভাবনী বিপণন কৌশল কাজে লাগাচ্ছে। বাংলাদেশের চায়ের বাজার অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। প্রথাগত ‘সিটিসি’ চায়ের গণ্ডি পেরিয়ে ইস্পাহানি, সিলন, ফিনলে, ফ্রেশ ও কাজী অ্যান্ড কাজীর মতো বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলো এই পরিবর্তিত বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রতিনিয়ত উদ্ভাবনী বিপণন কৌশল ও নতুন পণ্যের বহুমাত্রিকরণের মাধ্যমে নতুন ভোক্তা ধরতে চেষ্টা করে যাচ্ছে।
অনেক প্রতিষ্ঠান খুচরা বিক্রেতাদের অন্যান্য ব্র্যান্ডের চেয়ে বেশি মুনাফার প্রস্তাব দিয়ে ‘পুশ সেলস’-এর মাধ্যমে নিজেদের পণ্য ক্রেতার হাতে পৌঁছে দেওয়ার নতুন নতুন কৌশল নিচ্ছে। পাশাপাশি প্যাকেজিংয়ে আসছে নিত্যনতুন উদ্ভাবন। সাধারণ কাগজের প্যাকেটের বদলে জায়গা করে নিচ্ছে আকর্ষণীয় ফয়েল প্যাক, জিপলক ব্যাগ, স্ট্যাপল পিনমুক্ত টি-ব্যাগ বা পিরামিড আকৃতির প্রিমিয়াম টি-ব্যাগ।
বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় চায়ের গুণগত মান ও ক্যাফেইনের মাত্রায় ভিন্নতা থাকলেও আধুনিক ব্র্যান্ডিং, আকর্ষণীয় প্যাকেজিং, সহজলভ্যতা ও বিক্রেতার সুপারিশই এখন বাজারে টিকে থাকার মূল নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে এ অঞ্চলের মানুষ কড়া ও গাঢ় লাল লিকারের এবং দুধ-চিনি মিশ্রিত ‘সিটিসি’ ব্ল্যাক টি পানেই বেশি অভ্যস্ত। কিন্তু বিশ্বায়ন, নগরায়ন ও স্বাস্থ্যসচেতনতার ব্যাপক বিস্তারের ফলে চা পানে ভোক্তাদের আচরণে এখন সুস্পষ্ট ও গুণগত পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের কাছে এখন নিত্যদিনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে গ্রিন টি বা সবুজ চা। সম্পূর্ণ গাঁজনমুক্ত রাখার ফলে গ্রিন টি-তে থাকা উপকারী পলিফেনল ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট অক্ষুণ্ন থাকে, যা শরীরের মেটাবিজম বা বিপাকীয় হার বাড়িয়ে স্বাভাবিকভাবে ওজন কমাতে সাহায্য করে এবং ত্বক সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের কাছে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে নানা স্বাদের ফ্লেভারড চা। আদা, লেবু, তুলসী, জেসমিন, পুদিনাপাতা থেকে শুরু করে সিলেটের বিখ্যাত সাতকরা ফ্লেভারের চা এখন বাজারে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। কর্মব্যস্ত শহুরে জীবনে দ্রুত সতেজতা ও ভিন্নধর্মী স্বাদ আনতে এসব ভ্যালু-অ্যাডেড বা মূল্য সংযোজিত চা দারুণ সাড়া ফেলেছে।
ভোক্তাদের ‘স্পেশালিটি’ ও ‘অর্গানিক’ চায়ের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি। আধুনিক ভোক্তারা এখন কেবল স্বাদ বা রঙের ওপর নির্ভর করছেন না, তাঁরা চায়ের বিশুদ্ধতা ও উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়েও অত্যন্ত সচেতন। কোনো প্রকার রাসায়নিক সার ও ক্ষতিকর কীটনাশক ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত অর্গানিক চা এখন স্বাস্থ্যসচেতন ও অভিজাত শ্রেণির প্রথম পছন্দ। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এসব চা সাধারণ চায়ের চেয়ে বেশ চড়া মূল্যে বিক্রি হলেও এর চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে।
এ ছাড়া বিলাসবহুল লাইফস্টাইলের অংশ হিসেবে বাজারে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে ‘হোয়াইট টি’ বা সাদা চা এবং প্রিমিয়াম স্পেশালিটি গ্রিন টি। কচি কুঁড়ি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সংগ্রহ করে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি করা এসব চায়ের উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। খুচরা বাজারে এসব প্রিমিয়াম চায়ের কেজি ১৬,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা। প্রচলিত চা প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত রয়েছে।
দেশের চায়ের বাজারে এখন আধুনিক বিপণন, আকর্ষণীয় প্যাকেজিং ও ভোক্তাদের রুচির বৈপ্লবিক বদল হয়েছে। বড় ব্র্যান্ডগুলোর এই সুস্থ প্রতিযোগিতা ও ভোক্তাদের বৈচিত্র্যময় চাহিদা দেশের চা–শিল্পকে আগামী দিনে একটি আন্তর্জাতিক মানের ও লাভজনক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
Published: আপডেট: ২১ মে ২০২৬, ০৫: ৩৮
Source: https://www.prothomalo.com/business/industry/iinf3y8r2c
Comments
No comments yet
Be the first to share your thoughts!