বাবার ওষুধের টাকা জোগাড় করতে শিশুটি ভ্যানগাড়ি চালায়

মাত্র ৯ বছর বয়সী শিশু হযরত আলী। সে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। অসুস্থ বাবার ওষুধের টাকা জোগাড় করতে এই বয়সে ধরেছে ব্যাটারিচালিত ভ্যানগাড়ির হ্যান্ডেল। প্রতিদিন মাদ্রাসা থেকে ফিরে এই ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ ও সদর উপজেলার গান্না বাজার সড়কে যাত্রী পরিবহনের কা করে যে টাকা পায়, তা বাবার ওষুধ আর সংসারের কাজে লাগে।
হযরত আলী ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার কমলাপুর গ্রামের ইসরাইল হোসেন মণ্ডলের ছেলে। ইসরাইলের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে সাকিল হোসেন ঢাকায় পোশাক কারখানায় চাকরি করেন এবং স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে সেখানেই থাকেন তাঁরা। সবার বড় মেয়ে সাথী খাতুনের বিয়ে দিয়েছেন। বৃদ্ধ মা রিজিয়া বেগম, স্ত্রী ফুলমতি আর ছোট ছেলে হযরত আলীকে নিয়ে ইসরাইলের সংসার। দেড় শতাংশ জমির ওপর টিনের বেড়ার ঘরে তাঁদের বসবাস।
ইসরাইল হোসেন মণ্ডল বলেন, কষ্ট হলেও তাঁর সংসার চলে যাচ্ছিল। তিনি অন্যের জমিতে কাজ করে সংসার চালাতেন। দুই বছর আগে একদিন শ্রীরামপুর মাঠে একটি গাছে ডাল কাটতে ওঠেন তিনি। সেই গাছ থেকে নিচে পড়ে তিনি মেরুদণ্ডে আঘাত পান। এর পর থেকে বিছানায় পড়ে আছেন। এক বছর তিনি বিভিন্ন হাসপাতাল ও চিকিৎসকের চেম্বার ঘুরেছেন, কিন্তু ভালো হতে পারেননি। চিকিৎসায় তাঁর প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়ে গেছে। স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা, নিজের বাড়িতে থাকা গরু-ছাগল বিক্রি করে খরচ জুগিয়েছেন। এরপর সব হারিয়ে বিছানায় পড়ে আছেন।
ইসরাইল হোসেনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অর্থের অভাবে চিকিৎসা নিতে না পারলেও তাঁর নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়, না হলে যন্ত্রণায় ঘুমাতে পারেন না। এ অবস্থায় তাঁর স্ত্রী মানুষের বাড়িতে কাজ করে নানাভাবে সংসার চালিয়ে আসছিলেন। কিন্তু এতে তাঁর ওষুধ আর সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। পরে বাধ্য হয়ে ছোট ছেলে হযরত আলীকে একটি ভ্যানগাড়ি চালানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
আলাপকালে শিশু হযরত আলী জানায়, সে সকালে মাদ্রাসায় যায়, দুপুর ১২টায় ফিরে আসে। বাড়ি ফিরে কিছু একটা মুখে দিয়ে ভ্যান নিয়ে বের হয়ে পড়ে। কালীগঞ্জ-গান্না সড়কে যাত্রী পরিবহন করে সে। এভাবে যাত্রী আনা-নেওয়া করে তার ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়, যা বাড়িতে দিয়ে দেয়। এই টাকা দিয়ে বাবার ওষুধের পাশাপাশি সংসারেরও কিছু খরচ মেটে। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে কিছু খাবার নিয়ে আসেন। এভাবে কষ্ট করে চলছে তাদের সংসার।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইসরাইল হোসেন মণ্ডলের অবস্থা দেখে একজন তাঁকে প্রতিবন্ধীদের ব্যবহার উপযোগী তিন চাকার ভ্যান দেন। যেটার ওপর বসে তিনি বাড়ির চারপাশে একটু ঘোরাঘুরি করতেন। কিন্তু সংসার চালানোর প্রয়োজনে সেই গাড়িটি আরেকটু বড় করে ভ্যানগাড়ির মতো করে ছেলের হাতে দিয়েছেন।
নিমতলা বাসস্ট্যান্ডের ব্যবসায়ী গোলাম সরোয়ার বলেন, ছেলেটিকে দেখলে চোখের পানি ধরে রাখা যায় না। তাঁরা যতটুকু পারেন সহযোগিতা করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, তিনি দ্রুতই শিশুটির খোঁজখবর নেবেন। শিশুটির বিষয়ে কী করা যায়, সেটাও দেখবেন।
Published: প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৬, ০৩: ৩০
Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/vi5d0a8gqm
Comments
No comments yet
Be the first to share your thoughts!