৩ লাখ সামরিক ড্রোন বানাতে গিয়ে কেন চীনের মুখাপেক্ষী হতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ড্রোন তৈরির কর্মসূচি হাতে নিয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা বা যুদ্ধ দপ্তর পেন্টাগন। এরই মধ্যে একমুখী হামলা চালাতে পারে—এমন ৩০ হাজার ড্রোন অর্ডার করেছে তারা। পেন্টাগন চাচ্ছে ২০২৮ সাল নাগাদ এমন তিন লাখ ড্রোন তৈরি করতে। তবে বিশাল এই উদ্যোগের মধ্যেই রয়েছে একটি দুর্বলতা।
দুর্বলতাটি নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা বলয়ের বাইরে কম মানুষই কথা বলেন। ড্রোনগুলো চালাতে বিরল খনিজ থেকে তৈরি চুম্বক প্রয়োজন। শিল্প–সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চুম্বকের ৯৮ শতাংশের মতো তৈরি হয় চীনে। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের অস্ত্রভান্ডারের আকার বাড়াতে বিরল খনিজের নিজস্ব সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
বিরল খনিজ থেকে শক্তিশালী চুম্বক তৈরি করা হয় (যেমন নিওডিমিয়াম–আয়রন–বোরন)। জটিল এক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এটি করা হয়। বর্তমানে এই শিল্পে আধিপত্য রয়েছে চীনের। এই সমস্যার সমাধান করতেই গড়ে উঠেছে ‘আরইঅ্যালয়সের’ মতো প্রতিষ্ঠান।
আরইঅ্যালয়সের দাবি, উত্তর আমেরিকায় খনি থেকে সরাসরি চুম্বক তৈরির একমাত্র সম্পূর্ণ সরবরাহব্যবস্থা তাদের রয়েছে। তারা এমন প্রক্রিয়াজাত ধাতু তৈরি করে, যা সামরিক খাতের চুম্বক উৎপাদনে ব্যবহার করা যায়। এতে চীনের কোনো সহায়তা প্রয়োজন হয় না।
পেন্টাগনকে কেন দ্রুত কাজ করতে হবে
পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাতে বিশ্লেষকেরা ইউক্রেনের দিকে তাকাচ্ছেন। গত দুই বছরে ড্রোন যুদ্ধক্ষেত্রকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে, যা মেশিনগান আবিষ্কারের প দেখা যায়নি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এক বছরেই ১২ লাখের বেশি ড্রোন তৈরি করেছে ইউক্রেন; আর এগুলোর প্রায় প্রতিটিতে ব্যবহার করা চুম্বক এসেছে চীনের সরবরাহব্যবস্থা থেকে।
এই শিক্ষা ওয়াশিংটন ভালোভাবেই লুফে নিয়েছে। গত জুনে ‘আনলিশিং আমেরিকান ড্রোন ডোমিনেন্স’ বা ‘যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোনের আধিপত্য বিস্তার’ নামের নির্বাহী আদেশে সই করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর উদ্দেশ্য সামরিক ও বাণিজ্যিক দুই খাতেই ড্রোনের উৎপাদন বাড়ানো। এক মাস পর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও ড্রোন কেনার প্রক্রিয়া জোরদার করার নির্দেশ দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের প্রতিরক্ষা বাজেটে ড্রোনের জন্য ১ হাজার ৩৬০ কোটি (১৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন) ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ–সংক্রান্ত পরিকল্পনায় ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তা এই বরাদ্দের মাধ্যমেই বোঝা যায়।
অর্থই সব সমাধান নয়
ড্রোন তৈরির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হাতে প্রচুর অর্থ রয়েছে। তবে এর পরও একটি সমস্যা রয়ে গেছে। তা হলো বিরল খনিজের ওপর দেশটির নির্ভরশীলতা। পেন্টাগনের আনুমানিক হিসাব হলো ড্রোনের মোটর থেকে শুরু করে সেন্সর—যুক্তরাষ্ট্রের ১ হাজার ৯০০টি অস্ত্রব্যবস্থার প্রায় ৮০ হাজার উপাদানে চীনের তৈরি বিরল খনিজ উপাদান ব্যবহার করা হয়।
ড্রোনের এই জোয়ার বৃহৎ পরিসরে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি খাতকেও নতুর রূপ দিচ্ছে। অ্যারোভাইরনমেন্ট, ক্রাটোস ডিফেন্স ও প্যালান্টিয়ার টেকনোলজিসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধ এবং এআইয়ের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার প্রযুক্তির আরও গভীরে প্রবেশ করছে। তবুও এই খাত শেষ পর্যন্ত একই চুম্বক সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
হিসাবটা খুব সহজ। চীন যদি এই বিরল খনিজ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প কোনো সরবরাহকারী নেই। অবশ্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিরল খনিজ খাতে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করছে। যেমন ভলকান নামের একটি প্রতিষ্ঠান চীনের বাইরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিরল খনিজের চুম্বক কারখানা তৈরি করছে। ট্রাম্প সরকার চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো বা পুরোপুরি বন্ধের যে চেষ্টা চালাচ্ছে, এটি তারই অংশ।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে খনি ব্যবসার অনুমোদনের জটিলতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। শিল্পসংক্রান্ত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে খনির অনুমতি পেতেই ৭ থেকে ১০ বছর সময় লেগে যায়। আর একটি নতুন খনি পুরোপুরি সচল করতে গড়ে প্রায় ২৯ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। যা বৈশ্বিক হিসাবে অন্যতম দীর্ঘ সময়।
হালকা বনাম ভারী বিরল খনিজ
যুক্তরাষ্ট্র সরকার অবশ্য ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে। ‘এমপি ম্যাটেরিয়ালস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ৪০ কোটি ডলারের শেয়ার কিনে নিয়েছে পেন্টাগন। ফলে তারা প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বেশি শেয়ারের মালিক হয়ে গেছে। এ ছাড়া অন্যান্য দেশীয় উৎপাদকদের ঋণ দিয়েছে প্রতিরক্ষা দপ্তর।
তবে পেন্টাগনের এই প্রচেষ্টার বেশির ভাগই হালকা প্রকৃতির বিরল খনিজ ঘিরে। যেমন নিওডিয়ামিয়াম এবং প্রাসিওডিয়ামিয়াম। এগুলো মূলত বৈদ্যুতিক গাড়ি ও সাধারণ ইলেকট্রনিকসের চুম্বকে ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে সামরিক ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন ভারী প্রকৃতির খনিজ। যেমন ডিসপ্রোসিয়াম ও টার্বিয়াম।
জেট ইঞ্জিন বা ড্রোনের মোটরের অতিরিক্ত তাপ ও চাপের মধ্যেও চুম্বকের কার্যক্ষমতা ধরে রাখে এই ভারী খনিজগুলো। এগুলো ছাড়া চুম্বক খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। এটাই সাধারণ বাণিজ্যিক যন্ত্রাংশ এবং সামরিক যন্ত্রাংশের মধ্যে মূল পার্থক্য তৈরি করে দেয়। তাই এখন বড় প্রশ্ন হলো—ড্রোনের ভেতরে থাকা চুম্বকের জন্য কি যুক্তরাষ্ট্র চীনের ওপর নির্ভর করবে; নাকি নিজেরাই তৈরি করতে পারবে?
Published: প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬, ১২: ৩৯
Comments
No comments yet
Be the first to share your thoughts!